রংপুর ব্যুরো: হিমাগারে আলু সংরক্ষণের অতিরিক্ত ভাড়া প্রত্যাহার, আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ ভর্তুকির দাবিতে রংপুরে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। দাবি আদায়ে কাফনের সাদা কাপড় পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেছেন তারা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আগামী ১৫ জুলাই থেকে আরও কঠোর আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বুধবার (১ জুলাই) সকালে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে রংপুর জেলা আলু চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা প্রায় তিন শতাধিক আলুচাষি ও ব্যবসায়ী অংশ নেন। কাফনের কাপড় পরে অনশনে বসে কৃষকরা তাদের চরম আর্থিক সংকট ও হতাশার প্রতীকী প্রকাশ ঘটান।
আন্দোলনরত কৃষকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা আলোচনা ছাড়াই চলতি মৌসুমে প্রতি ৫০ কেজি আলু সংরক্ষণের ভাড়া একতরফাভাবে ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে হিমাগার মালিকরা। এতে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে কৃষকরা আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
চাষিদের দাবি, বর্তমানে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ২৫ থেকে ২৬ টাকা ব্যয় হলেও বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে। ফলে প্রতি কেজিতে ১০ টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ই যখন উঠছে না, তখন অতিরিক্ত হিমাগার ভাড়া কৃষকদের জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনশনরত আলুচাষি রমজান আলী বলেন, "সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে আলু উৎপাদন করেই আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন বাজারে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে, তাতে খরচই উঠছে না। তার ওপর হিমাগারের বাড়তি ভাড়া আমাদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে। আমরা কৃষক, ভিক্ষুক নই। আমাদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা হোক, না হলে আলু চাষ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।"
আলুচাষি আবদুল মান্নান বলেন, "ঋণ করে আলু চাষ করেছি। এখন সেই ঋণ পরিশোধের কোনো পথ নেই। বাধ্য হয়ে আজ কাফনের কাপড় পরে অনশনে বসেছি। সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক আলু চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।"
আন্দোলনকারীরা জানান, প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে হিমাগার মালিকদের প্রকৃত ব্যয় সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। সে হিসেবে প্রতি বস্তার ভাড়া ২৫০ টাকা নির্ধারণ করাই যৌক্তিক। এ বিষয়ে একাধিকবার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
আন্দোলনকারীরা বলেন, কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে। কিন্তু বছরের পর বছর উৎপাদন বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় কৃষকরা ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশের আলু উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তা উভয়ই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৭ জুন একই দাবিতে রংপুর নগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেছিলেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। তবে দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় এবার আমরণ অনশনের মতো কঠোর কর্মসূচি বেছে নিয়েছেন তারা।
রংপুর জেলা আলু চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, "রংপুর অঞ্চলে এবার ৩০ লাখ টনের বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের আনন্দ এখন কৃষকদের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। একদিকে বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য নেই, অন্যদিকে হিমাগার ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।এতে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।আমাদের দাবি খুবই যৌক্তিক।
প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণের ভাড়া ২৫০ টাকায় নির্ধারণ করতে হবে, আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, বিদেশে আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। এসব দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী ১৫ জুলাই থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।"
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এখন জেলা প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সংকট নিরসনে কী উদ্যোগ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন রংপুরের হাজারো আলুচাষি।
এদিকে কয়েকঘণ্টা ব্যাপী চলা অনশনকারী আলু চাষিদের জুস খাইয়ে এ অনশন ভাঙান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।এসময় তিনি আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছি।তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তুলে ধরা হবে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় জেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করবে। আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার চেষ্টা করা হবে। কৃষকদের কোনো সমস্যা যেন দীর্ঘায়িত না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানালে কৃষকরা আমাদের আশ্বাসে সাড়া দিয়ে কর্মসূচি স্থগিত করেছেন।”
মন্তব্য (০)