রংপুর ব্যুরো: রংপুরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, জালিয়াতি এবং সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষা দেওয়ার অভিযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পুলিশের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ,প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও ফাঁস এবং বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল।
শনিবার (২০ জুন) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী।
গ্রেপ্তাররা হলেন— মো. তাওরাত আকরাম (২৭), মো. বাধন মিয়া (৩৭), মো. সাহেব আলী (২৬), মো. আতিকুর রহমান (৩৪), মো. আশরাফুল ইসলাম (৩৬) এবং মো. হাফিজ আল মামুন (২০)।
ডিবি সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে নগরীর ধাপ জেল রোড এলাকায় আরজি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সংলগ্ন একটি ভবনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে ১৫টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্ট্যাম্প, আটটি স্বাক্ষরিত চেক, তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র, চারটি মূল শিক্ষাগত সনদপত্র এবং পাঁচটি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সরকারি চাকরির বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া, অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া, প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং তা বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।”
তিনি বলেন, “চক্রটি কতদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
সনাতন চক্রবর্তী আরও বলেন, “সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। যারা মেধাবী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারদের ব্যবহৃত স্মার্টফোনগুলোতে বিভিন্ন পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য, যোগাযোগের মাধ্যম এবং জালিয়াতির আলামত রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া স্ট্যাম্প, জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষাগত সনদপত্রের বৈধতাও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, এসব আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির কার্যক্রমের বিস্তৃতি এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ও চক্র চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা এবং জাল কাগজপত্র তৈরির মতো অপরাধের মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে প্রকৃত মেধাবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ডিবির কর্মকর্তারা জানান, নিয়োগ পরীক্ষা কেন্দ্রিক যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, “সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা প্রতারণার সুযোগ নেই। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ডিবির এই অভিযান প্রমাণ করে, অপরাধীরা যতই কৌশল অবলম্বন করুক না কেন, তারা আইনের নজর এড়াতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে যেসব অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও আলামতের ভিত্তিতে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্তের কাজ চলছে। কেউ যদি মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে অবৈধ সুবিধা নিতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মন্তব্য (০)