ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতে প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ জমে উঠেছে। জেলার সদরের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতেই নির্বাচনী হাওয়া সবচেয়ে বেশি বইছে। তবে মাঠের এই উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক ও সংশয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাচনী মাঠে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের ঘরানার প্রার্থীরা সরাসরি মাঠে না থাকলেও অন্তরালে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অন্যদিকে, একশ্রেণির নতুন প্রার্থী মাঠে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন, যাদের একাংশের বিরুদ্ধে ‘মব’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতি তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু নতুন প্রার্থী মাদক সেবনকারী ও বিক্রেতাদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষের বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। চরের বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, উদ্যোগটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে নিরীহ মানুষকে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ তকমা দিয়ে মব জাস্টিসের শিকার করা হচ্ছে।
চরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ই আগস্টের পর হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা এসব নতুন নেতার গ্রহণযোগ্যতা চরের সাধারণ ভোটারদের কাছে খুবই কম। ফলে তারা কোনো না কোনো প্রভাবশালী সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এলাকার সাধারণ ভোটাররা মূলত পুরোনো ও পরীক্ষিত প্রার্থীদের প্রতিই বেশি আস্থা রাখছেন। তবে প্রকাশ্য কোন্দল ও মব-আতঙ্কের কারণে এখনই কেউ পছন্দের প্রার্থীর নাম মুখ ফুটে বলতে চাচ্ছেন না। ভোটারদের ভয়, এখন কারও নাম প্রকাশ করলে প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাদের ওপর হামলা বা মব তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের আমেজ নিয়ে কথা হয় স্থানীয় ভ্যানচালক কামালের সঙ্গে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "যারা মাদক বা বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত এবং যারা এলাকায় মব সৃষ্টি করে, তাদের আমরা ভোট দেবো না। যে ব্যক্তি আমাদের মতো গরিব মানুষকে ভালোবাসবে এবং বিপদে পাশে দাঁড়াবে, ভোট তাকেই দেবো।"
একই সুর শোনা গেল কৃষক সামাদের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, "৫ই আগস্টের পর এলাকায় কিছু নতুন নেতা সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে এলাকার সাধারণ মানুষের কোনো বিপদ-আপদে এদের কখনো দেখা যায়নি। তারা এখন রাতারাতি জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। চরের মানুষ এদের চেনে।"
পদ্মা নদীর নৌকার মাঝি কামরুল আক্ষেপ করে বলেন, "কিছু বালু ও ভূমিদস্যু নতুন নেতাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে সেলফি তোলে। এরপর সেই ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'জনসেবা করব' বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। আমরা কোনো অবস্থাতেই এদের ভোট দেবো না। আমরা চাই চরের মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝে—এমন একজন ভালো মানুষ জনপ্রতিনিধি হোক।"
চরের সাধারণ ভোটাররা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো ধরনের উগ্রতা, মব সৃষ্টি বা রাতারাতি নেতা বনে যাওয়া কাউকেই তারা চান না। যারা চরাঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন করবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, তাকেই তারা ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত করবেন।
মন্তব্য (০)