নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনার ১২ বছর পূর্ণ হলেও বিচার কাজ শেষ হয়নি। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সংঘটিত এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মামলা বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্টে ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিলেও আসামি পক্ষ থেকে মামলায় আপিলের সারসংক্ষেপ জমা হয়নি।ফলে ঝুলে আছে বিচার কাজ।দ্রুত বিচারের জন্য আজ সকালে নারায়ণগঞ্জের আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেছে নিহতের স্বজনরা।
গত বছরের সর্বশেষ শুনানিতে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলেছেন। গত বছরের অক্টোবরে মামলাটি শুনানি মুলতবি করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর সময়ের আরজির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ওই সময় পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন।
২০১৯ সাল থেকে আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে অপহরণ করে হত্যা মামলা। আপিল নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে। আপিলকারী পক্ষ সার সংক্ষেপ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব আসবে। তখন তারা দ্রুত সময়ে করতে পারবে। আর আসামিপক্ষের আইনজীবী বলছেন, সার সংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য তারা এখনো মক্কেলের ইনস্ট্রাকশন পাননি। ইনস্ট্রাকশন পেলে আপিলের সার সংক্ষেপ জমা দেবেন।
এখন এ সংক্রান্ত বিষয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক বলেন, আমরা আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছি। আসামি পক্ষ থেকে এখনো সারসংক্ষেপ জমা দেয়নি।
সাত খুন মামলায় ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তৎকালীন নেতা নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। অন্য ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিতরা ২০১৯ সালে পৃথক আপিল এবং লিভ টু আপিল করেন। এর মধ্যে ‘তারেক সাঈদ মোহাম্মদ বনাম রাষ্ট্র’ শিরোনামে আপিলটি ২১ অক্টোবর আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। আদালতে ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী (অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড) আব্দুল হাই।
পরে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক বলেছিলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল শুনানির দিন ধার্যের জন্য আবেদন করা হয়। চার সপ্তাহ পর শুনানি হবে। রাষ্ট্রপক্ষ এরই মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছে। আসামিপক্ষ এখনো দেয়নি।
আসামিপক্ষ থেকে সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য ছয় সপ্তাহ সময় চাওয়া হয় বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাই বলেন, আদালত চার সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলা হয়েছে।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি মরদেহ, পরদিন মেলে আরেকটি মরদেহ। নিহত অন্য ব্যক্তিরা হলেন নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম।
ঘটনার এক দিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা (পরে বহিষ্কৃত) নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় ১১ মে একই থানায় আরেকটি মামলা হয়। এ মামলার বাদী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। পরে দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে পুলিশ।
দুই মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে র্যাবের সাবেক ১৬ কর্মকর্তা-সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তার অপরাধজগতের ৯ সহযোগীসহ মোট ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। এছাড়া র্যাবের আরও ৯ সাবেক কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, ‘যারা দণ্ডিত ২০১৯ সালে তাদের পক্ষে একাধিক আপিল করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এই মামলায় আপিলকারী পক্ষকে সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ১৯ নভেম্বর মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ছিল। এই মামলায় আপিল করেছে দণ্ডিত ব্যক্তিরা। যত দ্রুত সম্ভব রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে। আপিলকারী পক্ষ সার সংক্ষেপ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ওপর দায়িত্ব আসবে। তখন আমরা দ্রুত সময়ে করতে পারবো। আমরা যে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চাই।’
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, ‘সার সংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য এখনো মক্কেলের ইনস্ট্রাকশন পাইনি। ইনস্ট্রাকশন পেলে আপিলের সার সংক্ষেপ জমা দেওয়া হবে।’
মন্তব্য (০)