রংপুর ব্যুরোঃ কখনো নিজেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কখনো সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আবার কখনো প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার জাল বিস্তার করছিলেন ওয়াহেদুল ইসলাম ওরফে রাজীব (৪০)। অবশেষে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাতে রংপুর নগরীর বড়বাড়ি মরিচটারী এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানা পুলিশ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ।পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে,সুপরিকল্পিতভাবে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলে বিভিন্ন পরিচয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন রাজীব। পরে লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতেন তিনি।
ভুক্তভোগী ওমায়ের ইসলাম (৩৩), যিনি অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর একজন সার্জেন্ট, জানান-পরিচিত দুই ব্যক্তি কামরান খান শাওন ও মেহেদী হাসান সাহসের মাধ্যমে তার সঙ্গে রাজীবের পরিচয় হয়। সে সময় রাজীব নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ‘আর.কে ট্রেডার্স’-এর মালিক হিসেবে পরিচয় দেন।
ওমায়ের বলেন, “তার কথায় বিশ্বাস করে ২০২৪ সালের ২৩ ও ২৮ সেপ্টেম্বর দুই দফায় মোট ৬৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করি। চুক্তিপত্র ও চেক দিলেও পরে আর কোনো টাকা ফেরত পাইনি। উল্টো মামলা করলে আমাকে ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হয়।”
ভুক্তভোগী লন্ডনপ্রবাসী ফরহাদ ইসলাম শান্ত জানান, আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয়ের সময় রাজীবকে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পরিচয় করানো হয়। এই বিশ্বাসে তিনি ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। এরপর থেকেই রাজীব গা-ঢাকা দেন। এ ঘটনায় রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি মামলা চলমান রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার জাকির হোসেন বলেন, “নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় দিয়ে আমার কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা নেয়। এখন আমি নিঃস্ব, পরিবারও ভেঙে গেছে।” একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রাকিব হোসেনসহ আরও অনেকে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজীবের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় ছিল। এই চক্রে ভুয়া সামরিক কর্মকর্তা, ভুয়া সরকারি আমলা এমনকি আইনি সহায়তার নামে ভুয়া আইনজীবীও যুক্ত ছিল। শরীয়তপুর, সাতক্ষীরা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার একাধিক ব্যক্তি এই চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একাধিক বিয়ে ও ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন রাজীব।রংপুরের মিঠাপুকুর, সাভারের রেডিও কলোনিসহ বিভিন্ন স্থানে তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের তদন্তে আরও জানা গেছে, নিজেকে আড়াল করতে এবং ভুক্তভোগীদের হয়রানি করতে মিথ্যা অপহরণ মামলা দায়ের করাও ছিল তার কৌশলের অংশ।এছাড়া রংপুর শহরের শাপলা চত্বর ও বড়বাড়ী এলাকায় শ্যালিকার নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয়ের তথ্যও পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার ও প্রতারিত অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।তারা বলেন, “এই প্রতারক চক্রের কারণে আমরা অনেকেই পথে বসেছি।আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হয়।”
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছিল।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।”
জানা গেছে, তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী ইউনিয়নের উত্তর কাঠুর গ্রামে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ১০-১২ বছর আগে এলাকা ছেড়ে গেলেও সেখানে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।তবে গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানায় তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা রয়েছে।
মন্তব্য (০)