লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটে স্ত্রী হত্যা পৃথক দুই মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, আরেকজনের যাবজ্জীবন রায় দিয়েছেন আদালতের বিচারক। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ মো. হায়দার আলী এক আসামীর মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করেন।
একইদিন দুপুর দুইটায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২ এর বিচারক এস এম শফিকুল ইসলাম অপর মামলায় এক আসামীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।
এজাহার থেকে জানা যায়, লালমনিরহাট সদর থানার গোকুন্ডা ইউনিয়নের গোকুন্ডা মুন্সিটারী এলাকার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে আতিকুল ইসলামের সঙ্গে কয়েক বছর আগে বিয়ে হয় মিতু আক্তারের। তাঁদের ৫ মাস বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকে পারিবারিক তুচ্ছ কারণে মিতুর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলো স্বামী আতিকুল।
গত ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাতে পারিবারিক কলহের জেরে আতিকুল মিতুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরবর্তীতে কাজের উদ্দেশ্যে পাবনা যেতে চাইলে মিতু তাতে বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আতিকুল প্রথমে মিতুর মাথায় ও মুখে কিল-ঘুষি মারেন। পরে ঘরের উঠানে থাকা একটি শক্ত প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে মিতুর শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধড়ক মারধর করেন। গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন মিতু আক্তার। এরপর আতিকুল বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর সকালে মিতুর শিশু সন্তান আতিকা আক্তারের কান্নাকাটি শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে বিছানায় মিতুর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর মিতুর বাবা ইসলাম মিয়া বাদী হয়ে লালমনিরহাট সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আতিকুলের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই আসামির বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সিনিয়র দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় আসামি মো. আতিকুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি তাঁকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। আইনি বিধান অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে তাঁর এই সাজা কার্যকর করা হবে। আদালত ওই রায় প্রদান করেন।
অপরদিকে, স্ত্রীকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা মামলায় আসামি মো. দুলাল হোসেনকে (৪০) যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক এস. এম. শফিকুল ইসলাম। দণ্ডপ্রাপ্ত দুলাল হোসেন পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের মোগলীবাড়ী (৮ নম্বর ওয়ার্ড) গ্রামের মৃত ওসমান আলীর ছেলে।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, ৩০২ ধারায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাঁর প্রথম অপরাধ, বয়সের বিষয়, পারিবারিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, ঘটনার সময়কার তাৎক্ষণিক উত্তেজনা এবং অনুশোচনা বিবেচনা করে তাঁকে সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলো। একই সঙ্গে তাঁকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মানলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক কলহ ও সন্দেহের জেরে পাটগ্রামের মোগলীবাড়ী গ্রামে স্ত্রী মোছা. সাহিদা বেগমকে (৩৮) বাঁশ দিয়ে মাথায় আঘাত করেন স্বামী দুলাল হোসেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় নিহতের ভাই মো. আশরাফ বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
লালমনিরহাট জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হুমায়ুন রেজা স্বপন জানান, স্ত্রী হত্যার ঘটনায় পৃথক দুই মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, আরেকজনের যাবজ্জীবন রায় দিয়েছেন আদালতের বিচারক। এ সময় উভয় আদালতের আসামিরা এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ বিচারিক কাজ শেষে বিজ্ঞ আদালত দুই মামলায় দুই আসামীর বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছেন তাতে বাদীপক্ষ, রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ পেয়েছেন। এমন রায়ের কারণে সমাজে প্রভাব পড়বে এবং অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।
মন্তব্য (০)