নিউজ ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্যানসারগুলোর মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার অন্যতম। তবে রোগটি নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনও নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শুধু ধূমপায়ীরাই ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন বা এ রোগ ধরা পড়লে মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং এসব ধারণার বেশিরভাগই সঠিক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, ২০১৮ সালে দেশটিতে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজারের বেশি নতুন ফুসফুসের ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়। একই বছরে রোগটিতে মারা যান প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। অন্যদিকে, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যানসারের পর ফুসফুসের ক্যানসার ছিল দ্বিতীয় সর্বাধিক শনাক্ত হওয়া ক্যানসার।
নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাইয়ের টিশ ক্যানসার ইনস্টিটিউটের থোরাসিক অনকোলজি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. ফ্রেড আর. হার্শ ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ১৩টি ভুল ধারণা এবং সেগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
শুধু ধূমপায়ীরাই ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন না
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান না করলেও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্তদের প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কখনও ধূমপান করেননি বা জীবনে ১০০টিরও কম সিগারেট খেয়েছেন। পরোক্ষ ধূমপান এবং রেডন গ্যাসের সংস্পর্শও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ঝুঁকি কমানোর উপায় রয়েছে
ধূমপান না করা বা ধূমপান ছেড়ে দেওয়া ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং উচ্চ ঝুঁকির ব্যক্তিদের জন্য লো-ডোজ সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে স্ক্রিনিং করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বয়স্করাই আক্রান্ত হন না
যদিও অধিকাংশ রোগীর বয়স ৬৫ বছরের বেশি, তবুও তরুণদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যানসার দেখা যায়। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন ড. হার্শ।
বায়ুদূষণ ঝুঁকি বাড়ায়, তবে ধূমপানের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর—এমন নয়
গবেষণায় বায়ুদূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এটি ধূমপানের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তবে দুই ধরনের ঝুঁকি একসঙ্গে থাকলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধূমপান করলেও ছেড়ে দিলে লাভ হয়
অনেকেই মনে করেন, বহু বছর ধূমপান করার পর তা ছেড়ে দিলে আর কোনো উপকার হয় না। চিকিৎসকদের মতে, যেকোনো বয়সে ধূমপান ত্যাগ করলে ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমে এবং আয়ুও বাড়তে পারে।
গাঁজা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়
গাঁজা সেবন ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ক্যানসার ধরা পড়ার পরও ধূমপান ছাড়ার সুফল রয়েছে
রোগ নির্ণয়ের পর ধূমপান ত্যাগ করলে চিকিৎসার ফল ভালো হতে পারে এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অস্ত্রোপচারে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে না
ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এটি ক্যানসার ছড়িয়ে দেয়—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ট্যালকম পাউডার শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণে ক্যানসার হয়—এমন প্রমাণ নেই
বর্তমান গবেষণায় ট্যালকম পাউডারের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অতীতে কিছু খনি শ্রমিকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি দেখা গেলেও এর পেছনে অন্য উপাদানও দায়ী থাকতে পারে।
সব রোগীর উপসর্গ থাকে না
অনেকের ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যানসার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই ধরা পড়ে। এ কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।
ফুসফুসের ক্যানসার মানেই মৃত্যু নয়
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার সাফল্যের হার ৬০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসার কারণে অনেক রোগী উন্নত পর্যায়েও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছেন।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট নিশ্চিত সুরক্ষা দেয় না
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী হলেও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধ হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
ধূমপানই একমাত্র ঝুঁকির কারণ নয়
পারিবারিক ইতিহাস, বায়ুদূষণ, রেডন গ্যাস, অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শ, বুকে রেডিয়েশন থেরাপি এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রেডন কী?
রেডন হলো মাটি ও শিলার মধ্যে থাকা ইউরেনিয়াম ভেঙে তৈরি হওয়া বর্ণহীন ও গন্ধহীন তেজস্ক্রিয় গ্যাস। এটি ঘরের ভেতরে জমে থাকতে পারে এবং দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রায় এর সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। যেহেতু গ্যাসটি দেখা, গন্ধ নেওয়া বা স্বাদে বোঝা যায় না, তাই পরীক্ষা ছাড়া এর উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুসের ক্যানসার সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল ধারণার কারণে অনেক মানুষ উপসর্গকে গুরুত্ব দেন না, স্ক্রিনিং এড়িয়ে যান বা চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। অথচ সময়মতো শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা রোগীদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
সূত্র: সামা টিভি অনলাইন
মন্তব্য (০)