
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধিঃ মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার সাভার এলাকার তাঁত মালিক লাভলু মিয়া (৪০) তার কারখানায় তাঁত রয়েছে ২০টি কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৬টিতে তৈরি হচ্ছে তাঁতের শাড়ি আর বাকি ১৪টি তাঁত কাপড়ের চাহিদা না থাকায় বন্ধ রেখেছেন তিনি।
ঈদকে সামনে রেখে অন্য সময় প্রাণ ফিরে পায় মানিকগঞ্জের তাঁত পল্লী। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে এবার চাঞ্চল্য নেই, নেই দিনরাত খট খট, ঝুম ঝুম আওয়াজ। অন্যান্য বার ঈদের সময় তাঁতিদের কর্ম ব্যস্ততা বাড়লেও এবার ঈদ মৌসুমেও মানিকগঞ্জের তাঁতিদের মুখে হাসি নেই।
ঈদুল ফিতরের আগের সময়টা হলো তাঁতিদের সুখের মৌসুম। কিন্তু তাঁতিরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন এই মৌসুমের জন্য। কারণ, এই সময়ে কাপড়ের দাম ও চাহিদা দুই ই বাড়ে। ফলে বাড়তি আয়ের আশায় দিন রাত পরিশ্রমে ব্যস্ত থাকেন তাঁরা। বন্ধ তাঁতগুলোও সচল হয়ে ওঠে এই মৌসুমে। তাঁতিদের আকাঙ্ক্ষিত এই মৌসুমে বন্ধ তাঁত চালু হওয়া দূরের কথা, সচল তাঁতগুলো চালু রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন তাঁতিরা। কারণ সুতা, রংসহ কাপড় তৈরির বিভিন্ন সামগ্রীর দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম কমেছে। যার কারনে তাঁত শ্রমিকদের মুজুরিও কমাতে বাধ্য হয়েছে মালিকরা। বিক্রি কম থাকায় মালিকরা আর মুজুরি কমে যাওয়ায় হতাশ তাঁত শ্রমিকরা।
জেলার বরাইদ ইউনিয়নের আগ সাভার, সাভার, দিঘুলিয়া ইউনিয়নের জালশুকা, চাচিতারা এবং দিঘুলিয়া গ্রামে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার তাঁত।
সাটুরিয়ায় উৎপাদিত তাঁতের কাপড়, থ্রি পিস, পাঞ্জাবির কাপড় এর চাহিদা ছিল এক সময় দেশের শীর্ষ সব নামিদামি ব্যান্ডের শো রুমে। এ এলাকার তাঁতিদের উৎপাদিত কাপড় দেশের বাহিরেও যেতো। কিন্তু বর্তমানে তাঁতের কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় ও দফায় দফায় সুতা, রঙসহ তাঁত কাপড়ের কাঁচামালের দাম বাড়ায় তাঁতের কাপড় তৈরি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছে না সাটুরিয়ার প্রান্তিক তাঁতিরা।
করোনার কারণে দুই বছর ও পরের কয়েক বছর ব্যবসা করতে পারেনি সাটুরিয়ার তাঁতিরা। আশায় বুক বেঁধে আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে তাঁত কারখানাগুলো চালু করলেও লাভের দেখা পাচ্ছে না তাঁতিরা।
উপজেলার সাভার গ্রামের তাঁত শ্রমিক মো: হানিফ (৪২) বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁতে কাপড় তৈরির কাজ করে সে। কয়েক বছর আগে ঈদের কয়েক মাস আগে থেকেই দিন রাত কাজ করে তৈরি করা হতো কাপড়। একটি কাপড় তৈরি করলে মুজুরি পাওয়া যেতো ১৫০ টাকা এখন সামনে ঈদ তেমন কাজ নেই, নেই তাতের কাপড়ের চাহিদা। এখন একটি কাপড় বানালে মুজুরি পাওয়া যায় ৮০ টাকা। সারা দিনে তৈরি করা যায় ৪ টি কাপড়।
তাঁত শ্রমিক হাবিবুর রহমান (৬৫) বলেন, ৪০ বছর ধরে তাঁতের কাজ করে সে। তাঁতের কাপড়ের আগের মতো চাহিদা নেই। মহাজনের অনেক তৈরি করে রাখা কাপড় বিক্রি করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তাঁতের কাজ নেই বললেই চলে, অন্য কাজ করতে পারে না তাই বাধ্য হয়ে কম মুজুরিতেও এ কাজ করে তারা।
উপজেলার বরাইদের তাঁত মালিক মো: রতন বলেন, ঈদুল ফিতরের বাজার সামনে রেখে যে সব কাপড় মজুত করে রেখেছিল, এখন মজুত কাপড় বাজারে ছেড়ে দেওয়ায় কাপড়ের দাম বাড়তে পারছে না। ফলে বর্তমানে তাঁতিরা যেসব কাপড় বুনছেন, বাজারে সেগুলোর প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না। তাঁতের কাপড়ের বাজারে বর্তমানে চাহিদা নেই, বিক্রিও নেই।
তাঁত মালিক লাভলু মিয়া বলেন, তাঁতের কাপড়ের চাহিদা বাড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময়। এ বারের ঈদে লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আশায় বুক বেঁধে তাঁতিরা কাপ তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করলেও বাজারে নিয়ে কাপড় বিক্রি করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছে। লোকসানের ভয়ে অনেকে পৈতৃক ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: দোলোয়ার হোসেন বলেন, সাভার এলাকাতে ৫ বছর আগেও প্রায় ২ হাজার তাঁত ছিল বর্তমানে আছে ৭০০ টি। দিন দিন লোকশানের কারনে ব্যবসা বাদ দিচ্ছে তাঁতিরা। ২ বছর আগেও যে তাঁতের কাপড় ১ হাজার টাকা বিক্রি করা যেতো বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। তাঁতের কাপড় তৈরির খরচ বেড়েছে কিন্তু বিক্রিতে দাম কমায় লাভ না হওয়া তাঁত বিক্রি করে দিচ্ছে তাঁত মালিকরা। এবার ঈদের জন্য তেমন কোন অর্ডার পায়নি তাঁতিরা। অনেক তাঁত বন্ধ রয়েছে।
মন্তব্য (০)