নড়াইল প্রতিনিধি : নড়াইল জেলা হাসপাতাল চিকিৎসাসেবার প্রতিষ্ঠান হলেও সেখানে একজন আউটসোর্সিং কর্মীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা, হুমকি, ধাক্কাধাক্কি ও হেনস্তার অভিযোগ রয়েছে সোহান সরদারের বিরুদ্ধে। একের পর এক অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—কার ছত্রছায়ায় হাসপাতাল চত্বরে সোহানের এই দাপট?
অভিযুক্ত সোহান সরদার নড়াইল পৌর এলাকার ভওয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নড়াইল জেলা হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের কাজে যুক্ত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে সোহান হাসপাতাল চত্বরে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। আগে নিষিদ্ধ সংগঠন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সরদার আলমগীর হোসেন আলমের ভাইপো পরিচয় দিয়ে প্রভাব দেখাতেন আর এখন বর্তমানে খুলনা বিভাগীয় কৃষক দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মোস্তর ভাইপো পরিচয় দিয়ে দাপট দেখানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
চিকিৎসা নিতে আসা সেলিনা বেগম বলেন, ‘আমি ১২০ নম্বর কক্ষে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম। তখন সোহান আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিয়ে ধাক্কা দেন এবং অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন।’
আরেক রোগী আবুল মিয়া বলেন, ‘আমি শুধু সোহানকে বলেছিলাম, আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, আমাকে একটু তাড়াতাড়ি দেখানো যায় কি না। এ কথা বলার পর সে আমাকে গালিগালাজ করে। আমি তাকে বলেছি, আমি তোমার বাবার বয়সী। আমাকে আগে দেখাতে না পারলে সেটি বললেই হতো। পরে সে আমাকে বলে, কাকা বেশি কথা বললে আপনার খবর আছে।’
আবুল মিয়া বলেন, ‘আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকজন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হাসপাতালের ১২০ নম্বর কক্ষের সামনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় সোহান তাদের ভিডিও ধারণে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, তিনি আরএমওর অনুমতি ছাড়া ভিডিও করা যাবে না বলে বাধা দেন। একপর্যায়ে একজন সাংবাদিকের হাতে থাকা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন। এর কয়েক দিন আগেও একজন সিনিয়র সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে সোহানের বিরুদ্ধে। পরে সাংবাদিকরা ১২০ নম্বর কক্ষে দায়িত্বরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাদের ভেতরে প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিকরা।
সাংবাদিকরা বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলে সোহান তাদের ধাক্কা দেন এবং নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তির লোক পরিচয় দিয়ে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় নড়াইলের সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সোহানের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম অভিযোগ নয়। হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রোগীদের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তিনি বিভিন্ন সময় বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোগী ও স্বজনদের সঙ্গেও তার দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন আউটসোর্সিং কর্মী কিংবা স্বেচ্ছাসেবক কীভাবে রোগী ও সাংবাদিকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোহানের এক প্রতিবেশী অভিযোগ করেন, সোহান নিয়মিত মাদক সেবন করেন এবং প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকেন। নারীদের নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও করেন ওই ব্যক্তি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে। সোহানের বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়ার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
নড়াইল জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুল গফফারের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইতিপূর্বে তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। তবে আমার হাত-পা বাঁধা। আপনারা মোস্ত ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন।’
তত্ত্বাবধায়কের এই বক্তব্যের পর আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কার কারণে তার ‘হাত-পা বাঁধা’? হাসপাতালের একজন কর্মীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নিতে পারছে না? আর একজন আউটসোর্সিং কর্মী কীভাবে হাসপাতালের রোগী ও সাংবাদিকদের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করছেন?
নড়াইল জেলা হাসপাতালের সেবার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রোগী, সাংবাদিক
মন্তব্য (০)