মানিকগঞ্জ প্রতিনিধিঃ মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় এখন চলছে পাট কাটার ভরা মৌসুম। খাল, বিল, ডোবা ও জলাশয়ে পাট জাগ দেওয়ার পর তা পানি থেকে তুলে আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে কৃষকদের পাশাপাশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গ্রামের নারীরাও। পারিশ্রমিক হিসেবে নগদ টাকা না নিয়ে পাটখড়ি সংগ্রহ করছেন তারা। এতে একদিকে কৃষকদের শ্রমিক খরচ কমছে, অন্যদিকে নারীদের ঘরে যোগ হচ্ছে বিনা খরচে জ্বালানি ও বেড়া তৈরির উপকরণ।
সম্প্রতি উপজেলার পাতিলাপাড়া এলাকায় দেখা যায়, কাঁধে করে কয়েক আঁটি পাটখড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন রেনু বেগম (৬০)। কথা হলে তিনি জানান, এলাকার কৃষকরা পাট জাগ দেওয়ার পর পানি থেকে তুলে দিলে গ্রামের কয়েকজন নারী মিলে সেই পাটের আঁশ ছাড়িয়ে দেন। কাজের বিনিময়ে তারা নগদ টাকা না নিয়ে পাটখড়ি সংগ্রহ করেন। পরে দিনভর রোদে পাটখড়ি শুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে যান।
রেনু বেগম বলেন, প্রতি বছর পাটের মৌসুমে আমরা এভাবে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করি। বিনিময়ে পাওয়া পাটখড়ি বাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। কিছু পাটখড়ি দিয়ে ঘরের বেড়াও দেওয়া যায়। এতে সংসারের খরচ কিছুটা কমে।
সাটুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর দৃশ্য এখন চোখে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রামের নিম্নআয়ের পরিবারের নারীরা দল বেঁধে সড়কের পাশে, খাল বিলের পাড়ে কিংবা বাড়ির আঙিনায় বসে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করছেন। নিজেদের জমির পাটের পাশাপাশি অন্য কৃষকের পাটের আঁশ ছাড়িয়েও পাটখড়ি সংগ্রহ করছেন তারা।
কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পাটের আঁশ ছাড়াতে আলাদা শ্রমিক রাখলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে গ্রামের নারীরা পাটখড়ির বিনিময়ে আঁশ ছাড়িয়ে দেওয়ায় উভয় পক্ষই উপকৃত হচ্ছেন।
উপজেলার হাজিপুর বাগানবাড়ি গ্রামের সন্ধ্যা রানী (৫২) জানান, প্রতিদিন সকালে কৃষকরা ডোবায় জাগ দেওয়া পাট পানি থেকে তুলে দেন। এরপর এলাকার কয়েকজন নারী একসঙ্গে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে নেমে পড়েন। সাধারণত দুপুরের আগেই তারা এ কাজ শেষ করেন। আঁশ ছাড়ানোর পর পাটখড়ি বাড়ির আশপাশে শুকাতে দিয়ে সংসারের অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, সকালে কয়েকজন মিলে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করি। পাটখড়িগুলো নিয়ে বাড়িতে শুকাতে দিই। পরে এগুলো রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। এতে বাজার থেকে জ্বালানি কেনার খরচ কমে।
একই এলাকার ফারজানা (৪০) বলেন, পাট কাটার মৌসুমে গ্রামের অনেক নারীই সংসারের কাজের পাশাপাশি অন্যের জমির পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন। দিনে একজন নারী প্রায় ১০ থেকে ২০ আঁটি পর্যন্ত পাটখড়ি সংগ্রহ করতে পারেন। এসব পাটখড়ি রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার কেউ কেউ রান্নাঘর ও বাড়ির বেড়া তৈরিতেও ব্যবহার করেন।
উপজেলার ভাটারা গ্রামের কৃষক আমছের (৪৮) বলেন, বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি প্রায় এক হাজার টাকা। এর সঙ্গে খাবারও দিতে হয়। এভাবে শ্রমিক নিয়ে পাটের আঁশ ছাড়ালে কৃষকের খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাই পাট জাগ দেওয়ার পর পানি থেকে তুলে রাখলে গ্রামের নারীরা এসে আঁশ ছাড়িয়ে পাটখড়ি নিয়ে যান। এতে কৃষকেরও সুবিধা হয়, নারীরাও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পেয়ে যান।
স্থানীয়রা জানান, পাটখড়ি শুধু রান্নার জ্বালানি হিসেবেই নয়, গ্রামীণ জীবনে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। বাড়ির চারপাশে অস্থায়ী বেড়া দেওয়া, রান্নাঘরের বেড়া তৈরি, গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে পাটখড়ি ব্যবহার করা হয়। আবার অনেক পরিবার নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত পাটখড়ি আঁটি হিসেবে বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করে।
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি পাট মৌসুমে উপজেলায় ৪৫৪ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাস্তবে ৪৬১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানিয়া তাবাসসুম বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রামের নারীরা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে পারিশ্রমিক হিসেবে পাটখড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কৃষকদের শ্রমিক খরচ কমছে এবং নারীরাও প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য পাটখড়ি পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, পাটখড়ি জ্বালানি ও বেড়া তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। পাটখড়ি জ্বালানোর পর যে ছাই বা বায়োচার তৈরি হয়, তা জমিতে ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
মন্তব্য (০)