নিউজ ডেস্ক : ইতিহাসে প্রথম কোনো ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে ১.২ বিলিয়ন ইউরোর বেশি আয়ের এক অনন্য রেকর্ড গড়েছে স্প্যানিশ ফুটবল জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ।
গত ২৮ জুলাই ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুমোদন করেছে, যা ক্লাবটিকে বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
খেলোয়াড় ট্রান্সফার ফি বাদ দিয়েই ক্লাবের মোট পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ১.২২১ বিলিয়ন ইউরোতে (প্রায় ১.৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। যা আগের বছরের তুলনায় ৩.১ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে কর পরবর্তী নিট মুনাফা ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬.৩ মিলিয়ন ইউরোতে। এর মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে টানা ২৬তম বছরের মতো লাভজনক আর্থিক বছর পার করল স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের এই ক্লাবটি।
২০১৮-১৯ মৌসুম (স্টেডিয়াম সংস্কার কাজ শুরু করার আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বছর) থেকে এখন পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের আয় ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো—এই আয়ের ৯৩ শতাংশই এসেছে ক্লাবের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন খাত থেকে; যা দলের জয়-পরাজয় কিংবা লিগের ব্রডকাস্ট চুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
গত সাত বছরে ক্লাবটির স্টেডিয়াম থেকে আয় ১০৭ শতাংশ বেড়ে ৩৬৩ মিলিয়ন ইউরো এবং মার্কেটিং ও স্পন্সরশিপ আয় ৮২ শতাংশ বেড়ে ৫৩৯ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর টেলিভিশন ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয় বেড়েছে মাত্র ১১ শতাংশ (৩১৯ মিলিয়ন ইউরো)। অর্থাৎ, মাঠের ফলাফলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বাণিজ্যিক সম্পদ দিয়ে ক্লাবটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তুলেছে।
রিয়াল মাদ্রিদ জানিয়েছে, আধুনিকায়নের পর বার্নাব্যু স্টেডিয়াম থেকে আয় এখন আগের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছর গ্যালারির বিভিন্ন অংশ বন্ধ রেখে কাজ চালানোর পর এখন এর সংস্কার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্টেডিয়াম প্রকল্পের পেছনে এ পর্যন্ত ক্লাবের মোট খরচ হয়েছে ১.৪০৮ বিলিয়ন ইউরো (১.৬ বিলিয়ন ডলার), যার বড় একটি অংশ (১.১০৮ বিলিয়ন ইউরো) ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান বাজারে প্রভাব ও অন্যান্য ক্লাবের অবস্থান
ডেলয়েটের ‘ফুটবল মানি লিগ’-এর বার্ষিক তালিকা অনুযায়ী, রিয়াল মাদ্রিদ টানা তিন বছর শীর্ষে অবস্থান করছে এবং তারা একমাত্র ক্লাব যারা টানা কয়েক বছর ধরে ১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় বজায় রেখেছে।
রিয়াল মাদ্রিদের পেছনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বার্সেলোনা (৯৭৪.৮ মিলিয়ন ইউরো)। তালিকায় পরবর্তী স্থানগুলোতে রয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ (৮৬০.৬ মিলিয়ন ইউরো), পিএসজি (৮৩৭ মিলিয়ন ইউরো) এবং লিভারপুল (৮৩৬.১ মিলিয়ন ইউরো)।
উল্লেখ্য, ফুটবল মানি লিগের ২৯ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো সেরা চারের মধ্যে ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের কোনো ক্লাব জায়গা করে নিতে পারেনি। যেখানে ম্যানচেস্টার সিটির আয় স্থবির ছিল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আয় বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো যেসব ক্লাব নিজেদের স্টেডিয়াম সংস্কার করে বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়িয়েছে, তারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করছে।
আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য
আয় বাড়লেও রিয়াল মাদ্রিদ তাদের খরচ নিয়ন্ত্রণে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। ২০১৮-১৯ মৌসুম থেকে খেলোয়াড়দের বেতন ও ট্রান্সফার ফি মিলিয়ে স্কোয়াডের খরচ ৩৭ শতাংশ বেড়ে ৬১৮ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা মোট আয়ের ৪৬ শতাংশ। ক্লাব কর্তৃপক্ষ বেতনের এই অনুপাতকে সবসময় ৫০ শতাংশের নিচে রাখার নীতি অনুসরণ করে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ নতুন খেলোয়াড় দলবদলে ১৬১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে এবং আগামী ২০২৬-২৭ মৌসুমেও ফুটবল ও বাস্কেটবল উভয় দলেই বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে তারা আরও ১৯২ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছে।
শক্ত আর্থিক অবস্থান
ক্লাবটির নিট আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ়। বর্তমানে ক্লাবের ইকুইটি ৬২৪ মিলিয়ন ইউরো, হাতে নগদ রয়েছে ৮৩ মিলিয়ন ইউরো এবং স্টেডিয়াম প্রকল্প বাদে তাদের নিট ঋণ মাত্র ৯ মিলিয়ন ইউরো।
সদস্যদের মালিকানাধীন ক্লাব হওয়ার কারণে রিয়াল মাদ্রিদ কোনো শেয়ারহোল্ডার লভ্যাংশ বণ্টন করে না; অর্জিত সমস্ত মুনাফা নিয়ম অনুযায়ী দল এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়।
এ ছাড়া, চলতি অর্থবছরে স্পেনের কর ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রায় ৩৫৪.৮ মিলিয়ন ইউরো অবদান রাখার তথ্যও প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে রিয়াল মাদ্রিদ।
সূত্র: ইয়াহু স্পোর্টস
মন্তব্য (০)