নিউজ ডেস্কঃ অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন—এমন জোর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং শুক্রবার দুপুরের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি।
আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বঙ্গভবনের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। একই ধরনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন বঙ্গভবনের কয়েকজন কর্মকর্তা। তবে তারা কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সরকারের অবস্থান কী?
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। তবে এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন আছে। সেটা গুঞ্জনই। তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সেটা তাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। রাষ্ট্রপতি চাইলে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারেন। এতে সরকারের বলার কিছু নেই।’ অর্থাৎ সরকার এখন পর্যন্ত পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিতও করছে না, আবার নাকচও করছে না।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনার পেছনে আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, সম্প্রতি লন্ডন সফরের সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বা বৈঠক করেছেন। এরপর থেকেই তাকে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়—এমন দাবিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি বিদেশে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট খবর আমাদের কাছে নেই। যদি এমন তথ্য পাওয়া যায়, অবশ্যই তদন্ত করা হবে।’
রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থাকে কেন্দ্র করেও নানা আলোচনা চলছে। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার স্নায়ু-সংক্রান্ত জটিলতা ধরা পড়েছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশে যেতে চান। সেই কারণেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে, রাষ্ট্রপতির চিকিৎসা-সংক্রান্ত এসব তথ্যও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন এর আগে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করান। পরে যুক্তরাজ্যে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তার হৃদযন্ত্রে নতুন করে ব্লক ধরা পড়ে। এরপর জরুরি ভিত্তিতে সফলভাবে এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়।
পদত্যাগ করলে কী হবে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
বর্তমান সংসদের স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। ফলে পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি কে?
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দলীয়ভাবে আলোচনায় আছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। পরে দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং বর্তমানে দলীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য। দলীয় সূত্র মতে, তিনি তুলনামূলকভাবে নীরব ও কম বিতর্কিত প্রোফাইলের নেতা হিসেবে পরিচিত।
নজরুল ইসলাম খান দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে দলের ভেতরে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
অন্যদিকে, আব্দুল মঈন খানও একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্বে আছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকজনের নাম ঘুরে বেড়ালেও সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে কোনো নাম নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি। ফলে এ মুহূর্তে সব আলোচনা কেবল রাজনৈতিক জল্পনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দায়িত্বকাল
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। একই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে দেশে সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সে সময় রাজনৈতিক দল, ছাত্র প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং নতুন সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করান।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে থাকলেও, এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে শুক্রবার রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সত্যিই পদত্যাগপত্র জমা দেয়া হয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মন্তব্য (০)