নিউজ ডেস্ক : ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে রাত্রিযাপন ও অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপে এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষর করেছেন। এখন সারসংক্ষেপটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হবে। পরে রাষ্ট্রপতির আদেশে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০২১ সালের ৯ জুন রাতে সাভার থানার ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১৪ জুন ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পরীমনি। সেই মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ছিলেন সাকলায়েন। পরীমনির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ ওঠার পর তাকে বদলি করা হয়েছিল এবং তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। এদিকে পরীমনির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১৮ জুলাই নাসির উদ্দিন মাহমুদ হত্যাচেষ্টা, মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। ওই মামলার প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ৪ আগস্ট পরীমনির বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। তখন তাকে বিদেশি মদসহ গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে তিন দফায় মোট ৭ দিন তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গ্রেফতারের ২৭ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর পরীমনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন।
রাত্রিযাপনের ঘটনায় সমালোচনা শুরুর পর প্রথমে সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে মিরপুরের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাকে ঝিনাইদহ ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়। ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গোলাম সাকলায়েন ডিএমপির ডিবিতে কর্মরত থাকার সময় পরীমনির সঙ্গে ঘটনাক্রমে দেখা হয় এবং যোগাযোগ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পরীমনির বাসায় নিয়মিত রাত্রিযাপন করতে শুরু করেন। পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখার দেওয়া তার ফোনের সিডিআর বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময়ে (দিনে ও রাতে) পরীমনির বাসায় অবস্থান করেছেন।
পরীমনির মোবাইলের ফরেনসিক রিপোর্ট (মামলার আলামত হিসাবে সিআইডির জব্দ করা) পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার ও পরীমনির আদান-প্রদান করা মেসেজগুলো (২৯ জুলাই ২০২১ থেকে ৩ আগস্ট ২০২১ তারিখ পর্যন্ত) সামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমনির ফেসবুক আইডি ও গোলাম সাকলায়েন সিথিল নামে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথন হয়েছে। তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে (১১ জুলাই ২০২১ থেকে ৪ আগস্ট ২০২১ পর্যন্ত) কথোপকথন সাধারণ পরিচিতি বা পেশাগত প্রয়োজনে স্থাপিত কোনো সম্পর্কের নয়, বরং অনৈতিক প্রেমের সম্পর্কের। ২০২১ সালের ১ আগস্ট ভোর ৬টা থেকে ২ আগস্ট রাত ৩টা পর্যন্ত রাজারবাগ মধুমতি পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্সে পরীমনির যাতায়াতের ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজের ফরেনসিক প্রতিবেদন করেছে সিআইডি। ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ ও সাক্ষীদের জবানবন্দিতে প্রতীয়মান হয়, সাকলায়েনের পূর্বপরিকল্পনা ও সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে বাসায় স্ত্রী না থাকাবস্থায় পরীমনি তার রাজারবাগের সরকারি বাসায় যান। সেখানে প্রায় ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করে ২ আগস্ট রাত দেড়টায় বাসা ত্যাগ করেন।
তার ও পরীমনির সম্পর্কের বিষয়টি বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়া, টেলিভিশন ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জনমনে এ বিষয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গোলাম সাকলায়েন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে সরকারি দায়িত্বের বাইরে পরীমনির সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও পরীমনির সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। পরীমনির সঙ্গে জন্মদিন উদ্যাপন ও নিজের সরকারি বাসভবনে নিজ স্ত্রীর অবর্তমানে সময় কাটিয়েছেন। বিষয়টি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এ প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বিবরণী জারি করা হয়। তিনি অভিযোগের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানি প্রার্থনা করেন। ওই বিভাগীয় মামলা তদন্তে করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হায়াত-উদ-দৌলা খাঁনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার তদন্তে সাকলায়েনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’র অভিযোগ প্রমাণিত হয়। গুরুদণ্ডের আওতায় কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না- সে মর্মে ২য় কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয় সাকলায়েনকে। এর উত্তরে তিনি চাকরি থেকে বরখাস্তকরণ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি চান। এ জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ১৩ জুন জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখার উপসচিব রোকেয়া পারভীন জুঁই স্বাক্ষরিত স্মারকে বিভাগীয় মামলায় তাকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানে’র বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের (পিএসসিতে) পরামর্শ চেয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, তদন্তে উঠে এসেছে, পরীমনির সঙ্গে সাকলায়েনের বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। তিনি পরীমনির বাসায় রাত্রিযাপন করতেন। সাকলায়েনের স্ত্রী তার (সাকলায়েন) সরকারি বাসায় না থাকার সময় পরীমনিও সেখানে রাত্রিযাপন করেছেন। এমনকি সাকলায়েনের বাসায় টানা ১৭ ঘণ্টা দুজন (পরী ও সাকলাইন) একসঙ্গে ছিলেন। এতে বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণের’ কারণে সাকলায়েনকে ‘গুরুদণ্ড’ হিসাবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পিএসসির মতামত নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।সাকলায়েনকে গুরুদণ্ড হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে।
মন্তব্য (০)