নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের উচল কাশিমপুর গ্রামে ব্যক্তি মালিকানা জমি জোর পূর্বক দখল করে মসজিদ থাকা শর্তেও আরেকটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৪ আন্দোলনের পর ওই গ্রামে হঠাৎ জেগে ওঠা কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ধর্মকে পুঁজি করে কতিপয় ব্যক্তিদের এমন জঘন্য কাজের কারণে বর্তমানে ওই গ্রামে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বড়ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটার আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের তারাটিয়া মৌজায় আর এস ৬২০ নম্বর খতিয়ান সাহেব উল্লা সরদার নামে প্রচলিত আছে। সাহেব উল্লা সরদার মৃত্যুকালে এক পুত্র কাসেম আলি সরদার এবং চার কন্যা ঝর্ণা বেওয়া, সকিনা বেওয়া, ফিরোজা বিবি, রাহেলা বিবিকে ওয়ারিস রেখে যান। তার মধ্যে হতে চার কন্যা ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ০৯তারিখে ৬১৭১ নম্বর দলিলে সাড়ে ১৬ শতক জমি উচলী কাশিমপুর গ্রামের জামে মসজিদ বরাবর হস্তান্তর করেন। উক্ত দলিল মূলে প্রাপ্ত হয়ে মসজিদ কমিটির সদস্যগণ সর্বসম্মতিক্রমে রেজুলেশন পূর্বক উক্ত জমি ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২১তারিখে ৫৩১১ নম্বর দলিলে মোঃ বেলাল শেখের সঙ্গে সাড়ে ১৬ শতক জমি এওয়াজ বিনিময় করেন। সেই দলিল মূলে মো: বেলাল শেখ নিজ নাম জারি (খারিজ) করে খাজনা প্রদান পূর্বক ২৬ বছর যাবৎ শান্তিপূর্ণ ভোগ দখলে থেকে জমিতে মাটি ভরাট করে বিভিন্ন গাছ রোপন এবং মৌসুমী আবাদ করে আসছেন। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ০২তারিখে নতুন মসজিদ কমিটি আত্রাই ভূমি অফিসে খারিজ বাতিল চেয়ে মিসকেস দায়ের করেন। উক্ত মিস কেসের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আত্রাই কাগজপত্র যাচাই-বাছাই দখল পরিদর্শন এবং শুনানির মাধ্যমে উক্ত মিসকেস না-মঞ্জুর করে নথিজাত করার আদেশ দেন এবং পূর্বের খারিজ বহাল রেখে উক্ত জমি বেলাল শেখ দখল করবেন মর্মে আদেশ প্রদান করেন। উক্ত আদেশের পরদিন ওই গ্রামের বাসিন্দা জালাল সরদার, সুমন শেখ ও মসজিদ কমিটির সদস্যসহ গ্রামের কিছু র্দুবৃত্তরা জমির গাছ কেটে অবৈধ প্রবেশ করে রাতারাতি উচল কাশিমপুর উত্তরপাড়া জামে মসজিদ নামে নতুন মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করে। বর্তমানে বহুতল ভবনের ভিত দিয়ে মসজিদ নির্মাণের কাজ চলমান রাখা হয়েছে।
উচল কাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উচল কাশিমপুর জামে মসজিদের তৎকালীন সময়ে মসজিদ কমিটির সদস্য মো: রফিকুল ইসলাম জানান সকল নিয়ম মেনে ১৯৯৯ সময়ে মসজিদ কমিটির সকল সদস্যর সর্বসম্মতিক্রমে মসজিদের উন্নয়নের স্বার্থে পতিত জমি শেখ বেলালকে দিয়ে মাঠের ফসলি জমির সাথে এওয়াজ করা হয়। এতোদিন কোন সমস্যা না হলেও ২০২৪ আন্দোলনের পর গ্রামের কিছু কতিপয় বিএনপি পন্থী মানুষরা গ্রামে নানা অরাজকতা চালিয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় গ্রামের হঠাৎ প্রভাবশালী বনে যাওয়া জালাল সরদার ও সুমন শেখের নেতৃত্বে একই গ্রামে আরেকটি নতুন মসজিদ নির্মাণের নামে প্রতিহিংসামূলক বেলালের জমি অবৈধ ভাবে দখল করেছে। এই মসজিদ নির্মাণের নামে তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদা আদায় শুরু করেছে। সেই চাঁদার সিংহভাগ অর্থই জালাল সরদার, সুমন শেখ সহ ওই দলের কতিপয় ব্যক্তিদের পেটে যাচ্ছে। এমন অরাজকতার প্রতিবাদ করতে গেলেই হুমকি-ধামকীর শিকার হতে হচ্ছে।
ওই গ্রামের আরেক বাসিন্দা মোস্তাক হোসেন জানান ছোট বেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি মসজিদের পক্ষ থেকে দেয়া পতিত জায়গাটিতে বেলাল অনেক অর্থ খচর করে ব্যবহারের উপযোগী করেছে। একই স্থানে নতুন মসজিদ না করে পুরাতন মসজিদই বহুতল ভবনে বিনির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু সম্প্রতি সময়ে গ্রামের জালাল সরদার সুমন শেখ সহ কতিপয় ব্যক্তিরা অবৈধ ভাবে বেলালের ব্যক্তিগত জমি জবরদখল করে মসজিদ নির্মাণের নামে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। আমরা গ্রামবাসীরা এমন অরাজকতার বিরুদ্ধে সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।
মো: বেলাল শেখের ছেলে সাকিব হোসেন জানান ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকে গ্রামের জালাল সরদার, সুমন শেখসহ ওই ওয়ার্ডের মেম্বার ও অন্যরা মিলে একটি গ্যাং তৈরি করেছে। সেই গ্যাং এর সদস্যরা তাদেরকে বিভিন্ন সময় কোন কারণ ছাড়াই একঘরে করে রেখেছে। তাদের বাড়ি ও মাঠের জমিতে কেউ কাজ করতে গেলেই তাদেরকে হুমকি-ধামকী দিয়ে আসছে। এমনকি গত কোরবানীর ইদে তাদের কোরবানী দেওয়া মাংসও সমাজের মাংসের সঙ্গে নেয়নি। তাদের দোকান ও অন্যান্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও নিয়মিত খুলতে দিচ্ছে না। বর্তমানে তারা এক ঘরে হয়ে বসবাস করছে। প্রশাসনকে বিষয়টি জানালে প্রশাসন আদালতে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করছে। অপরদিকে পুলিশ প্রশাসন রহস্যজনক ভাবে নিরব ভূমিকা পালন করছে। তারা এখন কোথায় গেলে সঠিক বিচার পাবে সেই আশায় বিভিন্ন দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।
উচল কামিশপুর গ্রামের মৃত-মজিবর রহমানের ছেলে ও উচল কাশিমপুর জামে মসজিদ কমিটির সাবেক সভাপতি মো: বেলাল শেখ জানান পুরাতন মসজিদেই ওয়াক্তের নামায আদায় করার মুসল্লী পাওয়া যায় না। আর বিগত সময়ে পুরাতন মসজিদকে আধুনিক করার কাজে জালাল, সুমনসহ অন্যরা কোনদিন সহযোগিতা করেনি। বরং মসজিদের আধুনিকায়নের সকল কাজে তারা বাঁধা দিয়ে এসেছে। আর দীর্ঘ ২৬ বছর পর এসে গ্রামের সকল বাসিন্দা নামাযী হয়ে গেছে তাই এখন তাদের নতুন মসজিদ নির্মাণ করার দরকার হলে জমি কিনে মসজিদ নির্মাণ করবে ব্যক্তি মালিকানা জমি অবৈধ ভাবে দখল করে আল্লাহর ঘর মসজিদ নির্মাণ করলে সেখানে আদায় করা নামায কতটুকু জায়েজ হবে। জমিতে থাকা কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মেহেগুনিসহ অন্যান্য গাছগুলো তারা কেটে হরিলুট করেছে। অপরদিকে একাধিক শুনানীর মাধ্যমে সহকারি কমিশনার (ভূমি) আত্রাই দখল করা ওই জমির প্রকৃত মালিক হিসেবে বেলালকে বৈধতা দিয়েছে। সেখানে তারা কিভাবে জোবরদখল করে ইবাদতের ঘর নির্মাণ করে। যেহেতু কোন প্রশাসনই সঠিক বিচার করছে না তাই তিনি আদালতের দুয়ারে গেছেন। আদালত নিশ্চয় তাকে সঠিক বিচার করে দিবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ওই গ্রামের মৃত-কাশেস উদ্দিনের ছেলে ও উচল কাশিমপুর (উত্তরপাড়া) জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো: জালাল সরদার জানান বেলাল ও তার বাবা দীর্ঘ প্রায় ৫০বছর যাবত গ্রামের মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে নিজেদের ইচ্ছে মাফিক কাজ করে এসেছেন। বর্তমানে পুরাতন মসজিদের অবস্থা খুবই খারাপ। কখন যে ভেঙ্গে পড়বে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আর মসজিদে যাতায়াতের কোন রাস্তাও নেই। খাটিয়া বের করার মতো কোন রাস্তা নেই। এতোবছর যেহেতু বেলাল পেশীবলের জোরে মসজিদ শাসন করেছে তাই গ্রামবাসীরা চাইলেও কিছু করতে পারেনি। অনেকবার মসজিদের জমির কাগজপত্রাদি বেলালের কাছে চাওয়া হলে বেলাল কখনই সেগুলো দেখায়নি। তাই বর্তমানে একটি নতুন মসজিদ করার কোন বিকল্প নেই। আর যেহেতু আমার ফুফুরা মসজিদকে বেলালের এই জমি দান করে গেছে তাই সকল কাগজপত্রাদি ঠিক থাকার কারণে আমরা গ্রামবাসীরা মিলে প্রয়োজনের তাগিদে সেই জমিতে মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করেছি।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান জানান ওই জমির কাগজপত্রাদি অনুসারে বৈধ মালিক হচ্ছেন বেলাল শেখ। এরপরও যদি তার জমি দখল করে কেউ মসজিদ নির্মাণ করেন তাহলে দ্রুত বিচারের জন্য জেলা প্রশাসকের আদালতে না হলে স্থায়ী বিচারের জন্য আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন বেলাল শেখ। অপরদিকে আদালত থেকে যে নির্দেশনা তার কাছে আসবে সেই অনুপাতে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।
যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয় তাহলে দু’পক্ষের দ্বন্দ্ব আরো বিস্তার লাভ করবে। যে কোন সময় দু’পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা।
মন্তব্য (০)