নিউজ ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ফলের ক্যারেটের মধ্যে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ১৬ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো শাখার নিরাপত্তা, পণ্য ছাড়করণ প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কীভাবে বিদেশ থেকে আসা ফলের চালানের সঙ্গে কার্গো ভিলেজ পর্যন্ত পৌঁছাল, সংশ্লিষ্ট চালানটি কোন কোন ধাপ অতিক্রম করেছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
গত ১৯ জুলাই ২০২৬ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে বিমানবন্দরের বর্তমান আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সের গেট ৮(এ)-এর অভ্যন্তরে বিজিএমইএ শেডের পেছনে সন্দেহজনক একটি ফলের চালান শনাক্ত করা হয়। পরে চালানটি স্ক্যান ও ইনভেন্টরির জন্য কাস্টমস হাউস, ঢাকার অধীন এক্সপ্রেস সার্ভিস ইউনিটের গেট-৯ এলাকায় নেওয়া হয়।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম দফায় ফলের চালানের মধ্যে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। তবে চালানটি যে কাঠের সমতল পাটাতনের ওপর রাখা ছিল, সেটি নিয়ে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। পরে পাটাতনটি স্ক্যানিং মেশিনে পরীক্ষা করলে এর ভেতরে স্বর্ণসদৃশ ধাতব বস্তুর অস্তিত্বের প্রাথমিক আলামত পাওয়া যায়।
এরপর বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কাঠের পাটাতনটি খুলে হলুদ রঙের স্কচটেপে মোড়ানো ১৬টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বারের ওজন ছিল এক কেজি করে। অর্থাৎ মোট ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। জব্দ তালিকায় স্বর্ণের বারগুলোর গায়ে সিরিয়াল নম্বর এবং কয়েকটির গায়ে ‘KILO’ লেখা থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তীতে স্বর্ণ পরীক্ষক দি নিউ ইসলাম জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী মো. মাহফুজুল ইসলাম বারগুলোর ওজন ও বিশুদ্ধমান পরীক্ষা করে প্রত্যয়ন দেন। ওই প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে স্বর্ণের চালানটি জব্দ করা হয়।
স্ক্যানার নেই, ম্যানুয়ালি পরীক্ষা কাস্টমস
১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের বিষয়ে ঢাকা কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, কার্গো এলাকায় কাস্টমসের নিজস্ব স্ক্যানার নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করতে হয়।
তিনি বলেন, স্বর্ণের বারগুলো ফলের চালানের কাঠামোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টমসই চালানটি শনাক্ত করে এবং স্বর্ণ উদ্ধার করে।
কার্গো এলাকায় স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তা জড়িত নন বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ বিভাগের মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা দুর্বল এমন অভিযোগও তিনি নাকচ করে দিয়ে বলেন, সেখানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
তবে ১৬ কেজির মতো বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ একটি ফলের চালানের কাঠের পাটাতনের ভেতরে লুকিয়ে কার্গো এলাকায় পৌঁছানোর ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান Food Link-এর স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম মোস্তফাকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চালানটি খালাসের জন্য ASYCUDA World System-এ A. RAZZAQUE TRADING নামের একটি সিএন্ডএফ এজেন্টকে ট্যাগ করা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়ে বিলের নথিতে FASTRACK CARGO SOLUTIONS LTD. নামের একটি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের তথ্যও পাওয়া যায়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মাস্টার ও হাউস এয়ারওয়ে বিলের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্য ১৯ জুলাই ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভের কাছে ডেলিভারি দেওয়া হয়।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক চালানটির প্রাথমিক কার্যক্রমের সময় সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধি হিসেবে একজন কাস্টমস সরকার উপস্থিত ছিলেন। এ সময়কার কার্যক্রম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা প্রতিনিধির বডি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।
অভিযান ও জব্দ প্রক্রিয়ার ভিডিও ফুটেজও বডি ক্যামেরায় ধারণ করা হয় এবং পরে চাহিদার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পেনড্রাইভে সরবরাহ করা হয়েছে বলে কাস্টমসের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
চালানটি বিমানবন্দরে আসার পর কোন কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী, সিএন্ডএফ প্রতিনিধি, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার বা অন্য ব্যক্তি এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এবং কার্গো ভিলেজে প্রবেশ থেকে শনাক্ত হওয়া পর্যন্ত কী কী নিরাপত্তা ধাপ অতিক্রম করেছে।
এক বছরে ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধার
কাস্টমসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৬০ কেজি ১৮৭ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে।
স্বর্ণ উদ্ধারের এই পরিমাণ চোরাচালানের প্রবণতা ও কার্গো নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বড় চালান শনাক্ত হওয়ার পর কার্গো এলাকায় পণ্য পরীক্ষা, স্ক্যানিং সক্ষমতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কার্গো নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ, চাঁদাবাজি, রোস্টার প্রভাবিত করা, পণ্য ছাড়করণে অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ সামনে এসেছে।
কার্গো শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. মইনউদ্দিন লোটাস, কর্মী নম্বর পি-৩৬৭৩৯-এর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, কার্গো শাখার সিএন্ডএফ এজেন্ট, রপ্তানি পণ্যের ফরওয়ার্ডার, হেলপার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুস বা চাঁদা আদায় করা হত। দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বদলি, চাকরিচ্যুতি কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, কার্গোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সেকশনে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে মইনউদ্দিন প্রভাব বিস্তার করতেন। বিশেষ করে স্পেস, ফরেন ক্যারিয়ার, গেট এবং ইমপোর্ট সিআর কাউন্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তার বারবার ডিউটি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে কার্গো বিভাগের ৩৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাক্ষর করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা প্রশাসনিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কার্গো পণ্য ছাড়করণে কাগজ জালিয়াতি, ভুয়া এক্সিট নম্বর ব্যবহার এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫-এর একটি ঘটনায় চারটি শিপমেন্টের কাগজপত্র ও এক্সিট নম্বর নিয়ে অনিয়ম করা হয়েছিল। বিমান কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে দায় নির্ধারণ করা হলেও পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
১,৯২১ কেজি পণ্যের হদিস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে চীন থেকে আমদানি করা ইলেকট্রনিক পণ্যের একটি চালান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে এয়ারওয়ে বিল নম্বর ৭৮৪-৬৯২৫৩৩৬৫, ৫৬ পিস এবং মোট ১,৯২১ কেজি পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ওই পণ্য সিএন্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়। পরে পণ্যগুলোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও কাস্টমসের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে এয়ারওয়ে বিল নম্বর ৬১৯-১০৭৭১৬৮১, ১৩২ পিস এবং প্রায় ৩,২৩৯ কেজি কার্গো পণ্য নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাল কাগজপত্র ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে ওই পণ্য ছাড় করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে মইনউদ্দিন ডেলিভারি গেটে দায়িত্বে ছিলেন।
এই অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়ে বিল, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, কাস্টমস ডকুমেন্ট, ডেলিভারি রেকর্ড, এক্সিট নম্বর এবং সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত বলে দাবি করা হাতে লেখা দুটি বক্তব্যেও কার্গোতে অতিরিক্ত কাজের বিনিময়ে টাকা পাওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে।
মো. আলী-আশরাফুজ্জামান, জি-৫২৭৯৬-এর নামে থাকা একটি বক্তব্যে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে সেটিকে কাজের বিনিময়ে ‘বকশিশ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে মোরশেদ ও আশরাফের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অন্য একটি বক্তব্যে কার্গো হেলপার খোরশেদ আলম, জি-৫২৫০৯-এর নামে অতিরিক্ত কাজ, নাইট চেকিং ও মালামাল লোডিংয়ের সঙ্গে বকশিশ পাওয়ার কথা লেখা রয়েছে।
কার্গো বিভাগের রোস্টার প্রণয়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একই কর্মকর্তা নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেকশনে বারবার দায়িত্ব পেয়েছেন এবং স্বাভাবিক রোটেশন অনুসরণ করা হয়নি। নিরাপত্তা বিভাগেও একই এলাকার একাধিক পোস্টে ধারাবাহিক দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অন্তত গত এক বছরের ডিউটি রোস্টার, সংশোধিত রোস্টার, উপস্থিতি রেজিস্টার এবং দায়িত্ব পরিবর্তনের অনুমোদনপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. মইনউদ্দিন লোটাসের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়গুলো যাচাই করছেন। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে মইনউদ্দিন লোটাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে এবং বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মন্তব্য (০)