• সমগ্র বাংলা

কুরবানির মাংস সংরক্ষণে ভুল করছেন না তো? জানালেন বাকৃবি অধ্যাপক

  • সমগ্র বাংলা

ছবিঃ সিএনআই

বাকৃবি প্রতিনিধি : পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে পশুর হাটগুলো জমে উঠেছে। কুরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই এবং পরবর্তী সময়ে মাংস সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে চলা স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কুরবানির হাটে মাংসের ভিত্তিতে সুস্থ পশু চেনা এবং মাংসের সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ।

তিনি বলেন, আমরা সাধারণত পশু জবাইয়ের দুই থেকে চার বা ছয় ঘণ্টার মধ্যে যে মাংস রান্না করে খাই, তা আসলে প্রকৃত মাংস নয়, বৈজ্ঞানিক ভাষায় তা কেবল পেশী বা মাসল। পশুর ভক্ষণযোগ্য অংশ বা কারকাসকে নির্দিষ্ট নিয়ম ও তাপমাত্রায় না রাখলে তা মাংসে রূপান্তরিত হয় না এবং এর ফলে মানুষ কেবল ফাইবার বা আঁশটুকুই পায়, যা শরীরের পুষ্টিতে পুরোপুরি কাজে লাগে না। 

অধ্যাপক জানান, জীবিত পশু জবাইয়ের সময় মাসলের তাপমাত্রা প্রায় ৪০°সে থাকে এবং মানবদেহ সরাসরি প্রোটিন গ্রহণ করতে পারে না বলে আগে তা অ্যামিনো এসিডে ভাঙা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এই রূপান্তর ও মাংসের (কারকাস) পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য তাপমাত্রা ধীরে ধীরে ১০–১৫°সে-এ নামতে হয় এবং এজন্য কারকাসকে প্রায় ৪°সে তাপমাত্রার কক্ষে টানা ২৪ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতে হয়। তিনি আরও বলেন, ৪০°সে থেকে ১০–১৫°সে-এ নামতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা লাগে এবং এরপর প্রোটিন ভেঙে অ্যামিনো এসিডে রূপান্তর হতে আরও ৮ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়, এই প্রক্রিয়া শেষ না হলে মাংস প্রকৃত অর্থে পরিপক্ব হয় না এবং তখন পুষ্টিগত দিক থেকে সম্পূর্ণতা পাওয়া যায় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মাংস শক্ত হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় অধ্যাপক বলেন, জবাইয়ের পর তাপমাত্রা ৪০°সে থেকে ৪°সে-এ নেমে এলে মাংসের অভ্যন্তরীণ মাইক্রোস্ট্রাকচার বা কঙ্কাল পেশী ফাইবার সংকুচিত হয়ে যায়। এ কাঠামোতে এপিমাইসিয়াম, পেরিমাইসিয়াম, এন্ডোমাইসিয়াম, ফাইবার, মায়োফাইব্রিল ও ফিলামেন্টসসহ বিভিন্ন স্তর থাকে, যেগুলোর সংকোচনের ফলে মাংসের ভেতরের জলীয় অংশ কোষের বাইরে চলে আসে। এরপর দ্রুত রান্না করলে প্রায় ৭০°সে তাপমাত্রায় কোষের বাইরের দেয়াল ফেটে পানি ঝোল বা মসলার সাথে মিশে যায়, ফলে মাংসের ভেতরে আর্দ্রতা না থাকায় তা শক্ত হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, মাংসকে নরম ও স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে হলে ৪°সে তাপমাত্রায় আরও দুই থেকে তিন দিন রেখে দিতে হয়। এতে মাংসে ড্রিপ চ্যানেল তৈরি হয়, যার মাধ্যমে বাইরে বের হওয়া পানি পুনরায় মাসল ফাইবারে ফিরে গিয়ে আর্দ্রতা বজায় রাখে, ফলে রান্নার পর মাংস নরম ও সুস্বাদু হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গরুর মাংসের আসল ফ্লেভার তৈরি হতে অন্তত তিন দিন সময় লাগে, এর আগে রান্না করলে এটিপির অবশিষ্টাংশজনিত নিউক্লিওটাইডের অপ্রিয় গন্ধ বা ইউরিক এসিডজাতীয় গন্ধ থেকে যেতে পারে, যা প্রকৃত মাংসের স্বাদ নয়।

মাংসের মানের ভিত্তিতে পশুর হাটে ভালো মানের গরু চেনার উপায় সম্পর্কে অধ্যাপক জানান, ভালো মাংসের জন্য গরুর শরীরের মাংসের বিন্যাস সমান ও সুষম হতে হবে। রানের অংশে অতিরিক্ত মাংস জমা বা শরীরজুড়ে আঙুরের থোকার মতো অস্বাভাবিক ক্লাস্টার ফর্মে মাংস থাকলে সেই মাংস সাধারণত কম সুস্বাদু হয়। তাঁর মতে, যেসব গরুর শরীরে মাংসের বণ্টন সর্বত্র সমান ও মসৃণ থাকে, সেগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা এবং তুলনামূলকভাবে ভালো মানের বলে ধরা হয়। এছাড়া গরুর গলার নিচের ঝুলন্ত অংশ যদি সমান ও স্বাভাবিক থাকে তবে মাংসের গঠন ভালো থাকে, কিন্তু এটি যদি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় (ইডিমার মতো) তাহলে তা শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

গরুর জাত ও মূল্যমান প্রসঙ্গে তিনি জানান, রেড চিটাগাং, শাহীওয়াল ক্রস, পাবনা ক্যাটেল কিংবা বগুড়ার সারিয়াকান্দির নর্দার্ন গ্রে-এর মতো প্রিমিয়াম দেশি জাতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান জাতের ক্রস ব্রিডিং করলে গরুর ওজন সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজির বেশি হয়ে যায়। তবে তাঁর মতে, ৩৫০ কেজির বেশি ওজনের গরুর মাংসে তুলনামূলকভাবে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়, কারণ এসব গরুতে দেশি ঘাস-লতা নির্ভর খাদ্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ফিড ব্যবহার করা হয়। এতে মাংস জুসি ও টেস্টি হলেও আসল অ্যারোমা ও শক্ত টেক্সচার কমে যায় এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই গুণগত মানের মাংসের জন্য ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি ওজনের দুই দাঁতের দেশি গরু উপযুক্ত বলে তিনি মত দেন।

ক্রেতারা হাটে দাঁত দেখতে না পারলে বা বিক্রেতা না দেখাতে চাইলে শিংয়ের গোড়া দেখে বয়স অনুমান করতে পারবেন বলে জানান তিনি। শিংয়ের রুট বা গোড়া তুলনামূলক মোটা হলে বুঝতে হবে গরুর দুটি দাঁত উঠেছে। দুই শিংয়ের মাঝখানের ফাঁকা বা গ্যাপ দেখে নতুন ক্রেতাদের পক্ষে বয়স বোঝা সম্ভব নয়।

মাংস ফ্রিজে সংরক্ষণের সমস্যা প্রসঙ্গে ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কুরবানির পর মাংস সরাসরি মাইনাস ১৮°সে ডিপ ফ্রিজে রাখা সঠিক পদ্ধতি নয়। এতে মাংসের স্বাভাবিক বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া, যেমন এটিপি ভাঙার ধাপ, সম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। পরে মাইনাস ১৮°সে থেকে প্রায় ২৫°সে কক্ষ তাপমাত্রায় ডি-ফ্রিজ করার সময় তাপমাত্রার বড় পার্থক্য এবং ভেতরের অপরিপক্ব অবস্থা মিলিয়ে মাংসের মাইক্রোস্ট্রাকচার ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে মাংস থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায় এবং টেক্সচার নষ্ট হয়ে ছিবড়ে বা ফাইবারজাতীয় অবশিষ্টাংশ তৈরি হতে পারে, যা স্বাভাবিক সংরক্ষণ পদ্ধতির তুলনায় নিম্নমানের বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মাংস সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে তিনি বলেন, মাংস পাওয়ার পর প্রথমে ব্যাকটেরিয়াল লোড কমাতে ও পচন রোধে ২৫–৩০°সে পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম ঠেকানোর জন্য অল্প সময়ের জন্য ডিপ ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। এরপর মাংস ১-২ কেজি করে প্যাকেট করে ৪°সে সাধারণ ফ্রিজের অংশে অন্তত ২৪–৪৮ ঘণ্টা রাখা উচিত, যাতে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে এবং স্বাভাবিক বায়োকেমিক্যাল পরিবর্তনের মাধ্যমে মাংসের গুণগত মান বজায় থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরে এই ধাপ সম্পন্ন হলে ডিপ ফ্রিজে স্থানান্তর করলে মাংস দীর্ঘ সময় প্রায় ছয় মাস থেকে এক বছর সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় এবং গুণগত মান তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে।

মন্তব্য (০)





image

নড়াইলে জামিনে মুক্ত হয়েই ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর হামলার অভ...

নড়াইল প্রতিনিধি : নড়াইলের আলোচিত বড়কুলা ৩ হত্যা মামলার আসামি...

image

সরকারি রাস্তার ইট তুলে পাকা বাথরুম, নতুন ইট বিছিয়ে রাস্তা...

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি : টাঙ্গাইলের ...

image

বগুড়ায় নানা আয়োজনে বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস পালিত

বগুড়া প্রতিনিধি : "নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা ...

image

পাবনায় ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে স্কুল শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ

পাবনা প্রতিনিধি : পাবনার চাটমোহরে টাকার লোভ দেখিয়ে ঘর ঝাড়ু...

image

কামতা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন: আগা...

গাজীপুর প্রতিনিধি : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণাল...

  • company_logo