রংপুর ব্যুরো: উত্তরবঙ্গের কৃষি শিক্ষা,গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার নাম এখন কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (কুড়িকৃবি)।
শুক্রবার (১৫ মে) সকালে টেলিফোনে উপাচার্যের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষার বাতিঘর।
সীমিত অবকাঠামো ও জনবল সংকটের মধ্যেও স্বচ্ছ প্রশাসন, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে কাজ করছে বর্তমান প্রশাসন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে এসেছে নতুন গতি। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৬ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই উপাচার্য ড. রাশেদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়মতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আনতে একের পর এক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দেশের অনেক নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুতেই অপরিকল্পিত নিয়োগ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ থাকলেও কুড়িকৃবি ভিন্নধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপনের পথে হাঁটছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ বোর্ড, একাডেমিক কাউন্সিল, অর্থ কমিটি ও সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় একাডেমিক কাউন্সিলের সভা এবং ২২ এপ্রিল সফলভাবে সম্পন্ন হয় দ্বিতীয় সিন্ডিকেট সভা।এসব সভায় শিক্ষা ও গবেষণাকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
উপাচার্য ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন,আমরা কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, উত্তরবঙ্গের কৃষি উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম, তদবির বা রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থাকবে না। মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে।”
তিনি আরও বলেন,নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের লবিং বা অসদুপায় সহ্য করা হবে না। প্রতিটি নিয়োগ লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হবে। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে।”
বর্তমান প্রশাসনের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় কুড়িকৃবি ইতোমধ্যেই কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর হার ছিল ৯৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা দেশের ৯টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাড়তি আস্থারই প্রতিফলন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের মিড-টার্ম পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে তৃতীয় ব্যাচের ভর্তি কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে। অভিজ্ঞ খণ্ডকালীন ও অতিথি শিক্ষকদের মাধ্যমে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেশনজটমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার সুফল পাচ্ছেন।
কুড়িকৃবিতে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আউটকাম বেইজড এডুকেশন (ওবিই) পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও কর্মমুখী হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি কৃষি গবেষণাকে উৎসাহিত করতে সাউথইস্ট ব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বিশেষ অনুদান প্রদান করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সিন্ডিকেট সভায় কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে চারটি বিশেষায়িত গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—চর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ফ্রেশওয়াটার ফিসারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং ভেজিটেবলস অ্যান্ড ফ্রুটস রিসার্চ ইনস্টিটিউট। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে অস্থায়ীভাবে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি হল চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে রোভার স্কাউট, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব ও ডিবেটিং সোসাইটির মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অগ্রযাত্রা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, পর্যাপ্ত সরকারি সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই দেশের অন্যতম আধুনিক কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে এবং উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
মন্তব্য (০)