পবিপ্রবি প্রতিনিধি : পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) উপাচার্যবিরোধী মানববন্ধনে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনায় অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। অভিযোগ উঠেছে, উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম নিজের পদ টিকিয়ে রাখতেই বহিরাগতদের দিয়ে এই হামলা চালিয়েছেন। এই ন্যাক্কারজনক হামলার বিচার ও উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে টানা তৃতীয় দিনের মতো ক্যাম্পাসে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে প্রশাসনিক অদক্ষতা, আধিপত্য বিস্তার ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা। নিয়মিত প্রতিবাদের মুখে প্রায় অবাঞ্ছিত অবস্থায় থাকা উপাচার্য দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাজে অনেক সহময় তাকে ক্যাম্পাসে পাওয়া যায়নি এবং গত তিন মাসে শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠনের ব্যানারে তাকে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি।
এরই জেরে, গত সোমবার (১১ মে) সকাল ১০টায় উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে পূর্বঘোষিত অবস্থান কর্মসূচিতে জড়ো হন বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রভোস্ট, প্রক্টোরিয়াল বডি ও সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তারা। এ সময় বহিরাগত সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালালে পাঁচজন বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সাংবাদিক আহত হন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুমকি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
শিক্ষকদের এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে যোগ দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। আইন অনুষদের শিক্ষার্থী নেসার বলেন, "আমরা আর এই উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে দেখতে চাই না। শুধু নিজের চেয়ার রক্ষা করতে তিনি শিক্ষকদের ওপর হামলা করিয়েছেন। অতিসত্ত্বর পদত্যাগ করে তার উচিত ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে দিন।"
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষকদের যৌক্তিক আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই উপাচার্য বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে এই হামলা ঘটিয়েছেন। হামলার পক্ষে সাফাই গেয়ে দুমকি বণিক সমিতির সভাপতি বশির ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন, উপাচার্য তার আত্মীয় এবং তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রুখতেই তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিলেন। এছাড়া হামলাকারীদের কয়েকজনের ফেসবুক লাইভ থেকেও এই ঘটনার সঙ্গে উপাচার্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে।
হামলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবুল বাশার খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বহিরাগত সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকদের বেধড়ক পিটিয়েছে, যার ভিডিও ফুটেজ দেশবাসী দেখেছেন। কিন্তু উপাচার্য শিক্ষকদের পাশে এসে সহমর্মিতা প্রকাশ করা তো দূরের কথা, প্রক্টর হিসেবে আমাকে ফোন দিয়ে ক্যাম্পাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নেননি। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের নৈতিক অবস্থান তিনি হারিয়েছেন।"
পোস্ট গ্রাজুয়েট অ্যান্ড স্টাডিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান বলেন, "ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতা ও উপাচার্যের অপসারণ চেয়ে আমরা মানববন্ধন করছিলাম। সেখানে তার লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসীদের হামলা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক কলঙ্কজনক ইতিহাস। যার হাতে শিক্ষকদের রক্ত, সেই উপাচার্যকে আমরা একদিনের জন্যও আর এই ক্যাম্পাসে দেখতে চাই না।"
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "আমি এ মুহূর্তে ঢাকায় অবস্থান করছি। হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং আমি বিষয়টি অবগত হয়েছি। কারা, কী উদ্দেশ্যে হামলা করেছে—ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্তসাপেক্ষে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উপাচার্য হামলার বিষয়ে তদন্তের কথা বললেও, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষোভ থেকেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ পাওয়ায় শুরু থেকেই একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন ড. কাজী রফিকুল ইসলাম। নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে তিনি এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষকে চাকরির প্রলোভন দেখাতেন এবং ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বড় অঙ্কের কমিশন নিতেন। এছাড়া ডিন কাউন্সিলের মত উপেক্ষা করে ডিভিএম ও অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রি বাতিল করে ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ চালু করায় শিক্ষার্থীদেরও দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তিতে ফেলেছেন তিনি।
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী নাহিদ বলেন, "বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসায় এবং ক্যাম্পাসকে প্রকৃতভাবে ধারণ করতে না পারায় ও নিজের পদ টিকিয়ে রাখার লোভে এমন হীন কাজের সাথে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছে। আমাদের ক্যাম্পাসের জন্য আমাদের শিক্ষকদের চেয়ে বাইরের কেউ বেশি আন্তরিক হবেন না। তাই এই পদলোভী উপাচার্যকে সরিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হোক।"
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতন শিক্ষক মহল মনে করেন, একটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এখানে অসংখ্য যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু অতীতে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা উপাচার্যদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই এবার আর কোনোভাবেই বহিরাগত কাউকে আখের গুছিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মন্তব্য (০)