• সমগ্র বাংলা

বৈশা‌খী মেলার হা‌তি ঘোড়া পা‌খি তৈ‌রি‌ হয় মা‌নিকগ‌ঞ্জের যে গ্রা‌মে

  • সমগ্র বাংলা

ছবিঃ সিএনআই

মা‌নিকগঞ্জ প্রতিনিধি : পহেলা বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিন। মা‌নিকগ‌ঞ্জের সাটু‌রিয়ার বণিক পরিবারের সদস্যরা এখন অনেক ব্যস্ত। কারণ তাদের তৈরি হা‌তি, ঘোড়া, পা‌খিসহ বি‌ভিন্ন সাজ (খাবার) আসছে পহেলা বৈশাখের মেলায় বিক্রি হবে। 

বাংলা নতুন বছরকে বরণ করতে আয়োজিত বৈশাখী মেলার অন্যতম আকর্ষণ বা জন‌প্রিয় খাবার হ‌চ্ছে চিনির তৈরি হাতি, ঘোড়া, মুকুট, পাখি, নৌকা ও কদমা বাতাশা। এটি মানিকগঞ্জের প্রায় শত বছরের ঐতিহ্য। চিনি দিয়ে তৈরি হাতি ঘোড়া প্রস্তুতের কাজে কারিগররা ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে সাজ তৈরি। পহেলা বৈশাখ থেকে মাস জুড়ে মা‌নিকগঞ্জ ও দে‌শের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলা বসবে। শুধুমাত্র বৈশাখ উপলক্ষে মা‌নিকগ‌ঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত শতাধিক স্থানে বসবে মেলা। এসব মেলায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে চিনির তৈরির হাতি ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রানীর রূপের তৈরি চিনির তৈরি সাজ ও বাতাশা।

শত বছর ধ‌রে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাটারা গ্রামের কয়েকটি ব‌ণিক পরিবার সাজ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। পরিবারগুলো বাপ দাদার পেশা হিসেবে এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছে। প্রায় শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে তারা। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় তাদের কদর বেশি হয়। বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্য রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে ফরমায়েশ (অগ্রিম অর্ডার) দেন বাহারি রঙের সাজের। 

স্থানীয়রা জানায়, এখানকার গ্রামীণ মেলায় চিনির সাজ ও বিন্নি ধানের খই ছাড়া কল্পনা করা যায় না। সরেজমিন দেখা যায়, ভাটারা গ্রামের যে কয়টি বণিক পরিবার রয়েছে তারা সবাই ব্যস্ত সাজ তৈরি করতে। পহেলা বৈশাখের কাজ নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছে বনিক পরিবারের পুরুষ ম‌হিলা সবাই। সকালের সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের সাজ তৈরি এবং তা প্রক্রিয়া করার কাজ। গুড় ও চিনি পানিতে মিশিয়ে জাল করে রস বানিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাধু নানা রকমের সাজ। কেউ তৈরি করছে গুড়ের তৈরি বাতাসা আবার কেউ তৈরি করছে চিনির সাদা হাতি, ঘোড়া, মুকুট, নৌকা, পাখি, কদমা, মাছসহ নানা ধরনের সাজ। কে কার থেকে বেশি সাজ তৈরি করতে পারেন এ নিয়ে চলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। এ খেলা চলে মধ্যরাত পযর্ন্ত। বাবা মাকে সাহায্য করতে ঘরের শিশুরাও পিছিয়ে নেই। মা বাবার কাজ দেখে শিখেছে কিভাবে সাজ তৈরি করতে হয়। কিন্তু বাবা মা চান না ছেলে মেয়েরা এ পেশায় আসুক। তাদের চাওয়া সন্তানরা লেখাপড়া করুক। গুড় দিয়ে তৈরি করছে লাল রঙের বড় বাতাসা ও চিনি দিয়ে তৈরি করছে সাদা বাতাসা। এ ছাড়া কাঠের ফর্মার চিনির রস তৈর করে তা দিয়ে তৈরি করছেন হাতি, ঘোড়া, মুকুট, নৌকা, পাখি, কদমা, মাছসহ নানা ধরনের সাজ। এসব সাজ তৈরি হয় গুড় ও চিনি দিয়ে। বৈশাখে এলাকার বিভিন্ন মেলায় যা বিক্রি হবে। এ সব সাজ বিন্নির সঙ্গে বিক্রি করা হয়। মেলায় শুধু শিশুদের নয় বড়দের ও মন আকৃষ্ট করে ভাটারার বনিকদের তৈরি করা এসব সাজ। আর বৈশাখী মেলায় গিয়ে বিন্নির সঙ্গে সাজ না কিনলে মেলাই করা হয় না গ্রামের মানুষের। 

ভাটারার বাসু‌দেব বণিক ব‌লেন, তার দাদা কর‌তো বাবা কর‌তো এখন তারা কর‌ছে সাজ তৈ‌রি। শত বছর ধ‌রে তার প‌রিবার সাজ তৈ‌রি ব‌্যবসার সা‌থে জ‌ড়িত। ক‌য়েক বছর পূ‌র্বেও ভাটারা‌তে ৩০ প‌রিবার এ সাজ তৈ‌রির পেশার সা‌থে জ‌ড়িত থাক‌লেও বর্তমা‌নে মাত্র ৭/৮ প‌রিবার এ সাজ তৈ‌রির পেশা ধ‌রে রে‌খে‌ছে। বৈশাখ আর শীতের সময় বেশি চাহিদা থাকে সাজের। কারণ ওই সময় মেলা ও ওরস বেশি থাকে। প্রতিদিন সব মিলিয়ে ৩ থেকে ৪ মণ সাজ তৈরি করা যায়। মানিকগঞ্জ ছাড়াও এ সাজ টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও উত্তরাঞ্চলে পাইকারি বিক্রি করা হয়। এক মণ (৪০ কেজি) সাজ তারা পাইকা‌রি বি‌ক্রি ক‌রে (১৩০ টাকা কে‌জি) ৫ হাজার ২০০ টাকা। পাইকাররা তা মেলায় নি‌য়ে খুচরা বি‌ক্রি ক‌রে ১৮০ থে‌কে ২০০ টাকা কে‌জি।

ভাটরার ব‌নিক পাড়ায় সাজ কিনতে আসা পাইকার নরুন নবী জানায়, এখান থে‌কে তারা মেলার জন‌্য বাতাশা, সাজ, কদমা, তিলাসহ অন‌্যান‌্য খাবার সামগ্রী কি‌নে নি‌য়ে মেলায় বি‌ক্রি ক‌রে। প‌হেলা বৈশা‌খের মেলার জন‌্য সাজ কিন‌তে এ‌সেছে সে।

ভাটারার অর্চনা ব‌ণিক ব‌লেন, প‌রিবা‌রের অন‌্য সদস‌্যদের সা‌থে সা‌থে ব‌ণিক প‌রিবা‌রের গৃহবধুরাও সাজ তৈ‌রির কাজ ক‌রে থা‌কে। বছ‌রের অন‌্য সময়ের তুলনায় প‌হেলা বৈশা‌খের সময় দিন রাত সমা‌নে সাজ তৈ‌রির কাজ কর‌তে হয়। কারন এ সময় সা‌জের চাহিদা থা‌কে বে‌শি।

ভাটারার বিমল ব‌নিক ব‌লেন, সাজ তৈরিতে শুধু মাত্র চিনি লাগে। আর বড় বাতাসা বানাতে গেলে চিনির সঙ্গে খাঁ‌টি আখের গুড় লাগে। প্রথমে সিলভা‌রের পাতিলে চিনি জ্বাল দেওয়া হয়। চিনির সিরা তৈরি হলে গরম অবস্থায় সেটি কাঠের ফ্রেমে ঢালা হয়। ক‌য়েক মিনিট পর বের করে আনা হয় হা‌তি, ঘোড়া, পা‌খির চিনির সাজ। এবা‌রের প‌হেলা বৈশাখী মেলায় বি‌ক্রি জন‌্য অন‌্য বা‌রের তুলনায় বে‌শি চা‌হিদা র‌য়ে‌ছে সা‌জের। 

বা‌লিয়া‌টি ইউ‌নিয়ন প‌রিষ‌দের চেয়া‌রম‌্যান মীর সো‌হেল আহ‌ম্মেদ চৌধু‌রী ব‌লেন, ভাটরার ব‌ণিক প‌রিবারগু‌লোর শত বছরের ঐতিহ্য সাজ তৈ‌রি এ পেশাকে টি‌কি‌য়ে রে‌খে‌ছে। বৈশাখী মেলা উপল‌ক্ষে তারা ব‌্যস্ত সময় পার কর‌ছে সাজ তৈ‌রি‌তে। তারা নি‌জেরা নানা ভা‌বে অর্থ সংগ্রহ ক‌রে কষ্ট ক‌রে ব‌্যবসা প‌রিচালনা ক‌রে। সরকারী ভা‌বে য‌দি তা‌দের সহজ শ‌র্তে ঋ‌ণের ব‌্যবস্থা করা যে‌তো ত‌বে তারা ব‌্যবসাটা ভাল ভা‌বে কর‌তে পার‌তো।

মন্তব্য (০)





  • company_logo