রংপুর ব্যুরো : গণভোট ও ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রংপুর বিভাগে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন।পুরো বিভাগজুড়ে চার হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে দুই হাজার ৫৬১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৮২৭টি কেন্দ্রকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে ৬ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রংপুর পুলিশ লাইন্সে নির্বাচনী ব্রিফিং প্যারেড শেষে এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইন। তিনি বলেন,“নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে জেলা পুলিশের আওতাধীন প্রতিটি কেন্দ্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
রংপুর জেলায় মোট ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এসব কেন্দ্রে ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব-সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে দায়িত্ব পালন করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভোটার, প্রার্থী এবং নির্বাচনী সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে একাধিক স্তরের পাহারা থাকবে।
এসপি মারুফাত হুসাইন জানান, ৩১৫টি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ সদস্যদের কাছে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি থাকবে নির্বাচন পূর্ববর্তী সময় থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, রংপুর জেলায় ২১৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১২১টি এবং আট উপজেলায় রয়েছে ৯৫টি ভোটকেন্দ্র। অতীতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, ভোটার ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্রের সীমানা প্রাচীর না থাকা, জনবহুল এলাকা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির কাছাকাছি অবস্থান-এসব বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) জানিয়েছে, জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটির আংশিক এলাকায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এসব এলাকার ২০৪টি ভোটকেন্দ্রে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে মাঠে থাকবে ৩০টি মোবাইল পেট্রোল টিম ও ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৭৫হাজার ৬৩৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ২৫৩ জন, পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩১ জন। জেলায় ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ৪৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রংপুরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২১৬
জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ২১৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি কেন্দ্রগুলো সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঝুঁকিতে ২৫০০ কেন্দ্র, অতিঝুঁকিপূর্ণ ৮২৭টি
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে এক কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে চার হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। তবে এর মধ্যে দুই হাজার ৫৬১টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।
নির্বাচনী নিরাপত্তায় প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রত্যন্ত বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রয়োজনে হেলিকপ্টারে করে সেনা সদস্য নামানো হবে।
এছাড়া রংপুর বিভাগে চার জেলায় তিন হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি কাজ করছে। বিজিবি সদস্যরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন,“ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করা হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ, বডিওর্ন ক্যামেরা ও লাইভ মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে।”
প্রশাসনের দাবি, সমন্বিত ও বহুমাত্রিক এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফলে রংপুর বিভাগে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
মন্তব্য (০)