নিউজ ডেস্কঃ আগামীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় চীন–বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ফোরামের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানে তিনি স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন এবং চীন সরকারের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
চীনের ‘শীর্ষস্থানীয়’ শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী এবং বায়োমেডিক্যাল, অবকাঠামো, ডিজিটাল ও আইন খাতের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা তাদের বলেন, আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি এই দায়িত্ব ছেড়ে দেব এবং নতুন সরকার গঠিত হবে। তবে আমাদের দুই দেশের মধ্যে কাজ চলমান থাকতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে যে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, সে কথা বৈঠকে স্মরণ করেন নোবেলজয়ী ইউনূস।
তিনি বলেন, আমি চীনের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে দেখেছি কীভাবে মানুষের জীবন বদলে যাচ্ছে। পরে চীনা সরকারও এই নীতিমালা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজস্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গত মার্চ মাসে চীন সফরের কথা স্মরণ করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সে সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
তিনি আমাকে বলেছেন যে তিনি আমার বই পড়েছেন এবং তার নীতিগুলো অনুসরণ করেছেন। এটি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের মুহূর্ত ছিল। চীন সরকারের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাংলাদেশের সরকার প্রধান।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান এবং স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক ও বায়োমেডিক্যাল বিজ্ঞানী শিন-ইউয়ান ফু প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গির ‘প্রশংসা’ করেন। তিনি বাংলাদেশি শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কাজ করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজি’র বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সিনিয়র উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওয়ং এবং ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকের (সিঙ্গাপুর) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউকিং ইয়াও বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, ওয়ালভ্যাক্স ইতোমধ্যে অন্তত ২২টি দেশে ভ্যাকসিন রপ্তানি করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় সহায়ক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে এবং পিসিভি ও এইচপিভি ভ্যাকসিনের স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করছে। ইন্দোনেশিয়ায় একটি ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তারা স্থানীয় সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
চীন–বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ফোরামের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন- রোবোটিকস সোসাইটি অব সিঙ্গাপুরের ভাইস প্রেসিডেন্ট জিনসং ওয়াং, ফোরডাল ল ফার্মের চেয়ারম্যান ইউয়ান ফেং, বেইজিং উতং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লি র্যান, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রকল্পবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট গাও ঝিপেং, চায়না হুনান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বিনিয়োগ পরিচালক শু তিয়ানঝাও, চায়না সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুয়া জিয়ে, পাওয়ারচায়না ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বিদেশি বাজারবিষয়ক জেনারেল ম্যানেজার চেন শুজিয়ান, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মা শিয়াওইয়ুয়ান এবং চীন–বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ফোরামের সেক্রেটারি-জেনারেল অ্যালেক্স ওয়াং জেকাই।
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে জানান, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশন বিষয়ে বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং তরুণ বাংলাদেশিদের মেধা ও সম্ভাবনায় তারা ‘মুগ্ধ’।
অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা তাদের বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার স্বাস্থ্যসেবায়। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে চিকিৎসক ও রোগীর সংযোগ তৈরি করা যায়, চিকিৎসা ইতিহাস ডিজিটালি সংরক্ষণ করা যায় এবং সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়।
ওষুধ খাতে সামাজিক ব্যবসা মডেলের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন ইউনূস। তিনি বলেন, ওষুধ তৈরি করতে পয়সা লাগে, অথচ বিক্রি হয় ডলারে। আমরা এমন সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি চাই, যাদের মূল লক্ষ্য হবে মানুষের কল্যাণ, মুনাফা নয়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত ভ্যাকসিনের দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা পেটেন্টমুক্ত ভ্যাকসিনের পক্ষে কথা বলেছিলাম এবং বাধার মুখে পড়েছিলাম। ১০টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। তারা বলেছিল, ধনী দেশগুলো ভ্যাকসিন কিনে দরিদ্র দেশগুলোকে দান করবে। আমরা বলেছিলাম—আমাদের দান দরকার নেই। মানুষ মারা যাচ্ছিল, আর কেউ কেউ মুনাফা করছিল। এটা লজ্জাজনক। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একটি ‘হেলথ সিটি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, চীন সফরের সময় আমি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এক হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। অঞ্চলটি দরিদ্র হলেও ভারত, নেপাল ও ভুটানের খুব কাছাকাছি।
প্রস্তাবিত হেলথ সিটিতে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র, ভ্যাকসিন উৎপাদন ইউনিট, ওষুধ শিল্প এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেন্দ্র থাকবে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সব স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কার্যক্রম ওই শহরে থাকবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের মানুষও সেখান থেকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবে। অন্যদের মধ্যে সরকারের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (০)