নিউজ ডেস্কঃ ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী—দীর্ঘ এই পথ পেরিয়ে সদ্য পদত্যাগ করা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের ২৩তম ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ হওয়ার পথে।
বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তার নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রায় ছয় দশকের এই পথচলা। দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। বিষয়টি আজ (বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট) দুপুরে নিশ্চিত করেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় রয়েছে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য। পারিবারিক পরিবেশেই রাজনীতির সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়।
ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। ছাত্রজীবনেই যুক্ত হন রাজনীতিতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং অংশ নেন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে।
তবে পড়াশোনা শেষে সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে আসেননি মির্জা ফখরুল। কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষকতা করেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কয়েক বছর চাকরি করার পর ১৯৮৬ সালে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
রাজনীতিতে ফিরে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে দায়িত্ব পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির।
জাতীয় রাজনীতিতে তার বড় উত্থান ঘটে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পান তিনি। কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতেও তার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুলকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন।
বিএনপির মহাসচিব
২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে পান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব। এরপর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব হন।
এরপর প্রায় এক দশক বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন তিনি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সময়ে দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ পথের নতুন অধ্যায়
একজন ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং পরে দীর্ঘদিনের দলীয় মহাসচিব—মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে একাধিক বাঁক এসেছে। প্রতিটি পর্যায়েই বদলেছে তার দায়িত্ব ও পরিসর।
এবার সেই পথচলায় যুক্ত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব থেকে তার বিদায় শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনেরই পরিবর্তন নয়, দলের নেতৃত্ব কাঠামোতেও তৈরি করবে নতুন সমীকরণ। একই সঙ্গে সরকারের মন্ত্রিসভাতেও আসবে পরিবর্তন।
ঠাকুরগাঁওয়ের এক শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্ব, আর সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে।
মন্তব্য (০)