ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দীর্ঘদিনের জঞ্জাল কচুরিপানামুক্ত হয়েছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাঁচামাটিয়া নদী। দীর্ঘদিন ধরে দখল, দূষণ ও কচুরিপানার জঞ্জালে মৃতপ্রায় হয়ে পড়া নদীটি পরিষ্কার হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে নদীপাড়ের মানুষের জীবনে।
স্থানীয়রা জানান, নদী পরিষ্কারের ফলে মশা, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ, সাপ বিচ্ছুসহ নানা উপদ্রব থেকে রেহাই মিলেছে। একই সঙ্গে নদীটি পুনরুদ্ধারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সুশীলসমাজ ও নাগরিকদের দাবির একটি দৃশ্যমান ফল মিলেছে বলে মনে করছেন তারা।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত কাঁচামাটিয়া নদীটি একসময় এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম নদীপথ ছিল। নদীটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল জনপদ, হাট বাজার ও জীবিকা অর্জনের মাধ্যম। একসময় এ নদীপথে পালতোলা নৌকায় ধান, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহন করা হতো। নদী থেকে ধরা মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা। স্থানীয় কৃষকরাও এ নদীর পানি ব্যবহার করে শাকসবজি উৎপাদন ও বোরো ধান চাষ করতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দখল, দূষণ, অবৈধ স্থাপনা, বর্জ্য ফেলা এবং নাব্যতা সংকটের কারণে নদীটি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রূপ হারাতে থাকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর দুই পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, নদীর বুকে চর জেগে ওঠা, বিভিন্ন হাট-বাজার ও সড়কের পাশ থেকে বর্জ্য-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীটির পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ঈশ্বরগঞ্জ ব্রিজ থেকে পশ্চিমে থানা পর্যন্ত নদীর বিস্তীর্ণ অংশ কচুরিপানায় ঢেকে গিয়ে মশার অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছিল। এতে নদীতীরবর্তী দেড় হাজারের বেশি পরিবার দিনরাত মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। পাশাপাশি কচুরিপানার জটলা ও বদ্ধ পানির কারণে নদীপাড়ে সাপ, বিচ্ছু ও বিভিন্ন বিষাক্ত কীটপতঙ্গের উপদ্রবও বেড়েছিল।
এ অবস্থায় নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রকাশ, নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালন করা হয়। গত ৭ মে পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি) উপজেলা পরিষদের সামনে মানববন্ধন করে নদী দখলমুক্ত করা, বর্জ্য ফেলা বন্ধ, খনন কার্যক্রম শুরু এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানায়। এর আগে নদীর ভয়াবহ দূষণ, দখল ও কচুরিপানার কারণে জনদুর্ভোগ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ১২ জুন কাঁচামাটিয়া নদীর কচুরিপানা পরিষ্কারকরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ময়মনসিংহ-৮ ঈশ্বরগঞ্জ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। সে সময় তিনি বলেছিলেন, কাঁচামাটিয়া নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ নদীর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে।
সেই ধারাবাহিকতায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নদী থেকে কচুরিপানা অপসারণের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় ইতোমধ্যে এর সুফল পেতে শুরু করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে সন্ধ্যা নামলেই মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করত। এখন সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া জানান, নদীতে আকটাপড়া কচুরিপানায় বিষাক্ত পোকামাকড় ও সরীসৃপের উৎপাত থেকে আমরা এখন নিস্তার পেয়েছি। নদীতে মনোরম দৃশ্য বিরাজ করছে। অপর বাসিন্দা বাবুল ভুঁইয়া জানান, প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। পাশাপাশি কাঁচামাটিয়া নদীটি খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য মাননীয় সংসদ ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি।
পিএফজি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা কো-অর্ডিনেটর সাইফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, শুধু কচুরিপানা অপসারণ করলেই হবে না। নদীটির স্থায়ী পুনরুদ্ধারে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন, বর্জ্য ফেলা বন্ধ, তীর সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কাঁচামাটিয়া নদীকে পুরোপুরি বাঁচাতে হলে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই একদিন নদীটি ফিরে পাবে তার হারানো নাব্যতা ও ঐতিহ্য।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রহমান জানান, সংসদ সদস্যের সম্মতিক্রমে উপজেলা পরিষদের এডিপি ফান্ডের অর্থায়নে জনস্বার্থে এই কচুরিপানা অপসারণ করা হয়েছে। নদীটি খননের বিষয়ে জাতীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হলে তিনি নদীটি খননের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
মন্তব্য (০)