নিউজ ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ভিয়েতনাম ছিল গতকালের সফলতার গল্প, ইন্দোনেশিয়া আজকের বাস্তবতা আর বাংলাদেশ হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বুধবার রাজধানীর গুলশানে পুলিশ প্লাজায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিক সংকট থেকে দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বলে, দেশোপযোগী নীতি গ্রহণ করা গেলে অর্থনীতি আবারও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এগুলো হলো—নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসা পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষতিগ্রস্ত ও নতুন শিল্পে অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে এবারই প্রথম পাঁচ বছরের করনীতির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে আস্থা পাবেন। একই সঙ্গে লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে আরও ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, শিল্প খাতকে চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কোভিড-১৯ সময়ের মতো নির্বিচারে প্রণোদনা নয়, এবার কর্মদক্ষতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, টেকসই বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। এজন্য জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে কার্যকর রেলসংযোগ ছাড়া কৃষি ও শিল্পপণ্য দ্রুত পরিবহন সম্ভব নয়। তাই পরিবহন ব্যয় কমাতে সমন্বিত বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, শুধু শিক্ষা নয়, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নাগরিক মূল্যবোধ—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল অর্জন সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পাঁচ হাজার চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-এ উন্নীত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। শিশু থেকে প্রবীণ—সব নাগরিককে ধাপে ধাপে এই সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনতে হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতি কমানোর মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন এবং তথ্য উন্মুক্তকরণে ব্যাপক সংস্কার আনা হবে।
তিনি বলেন, সরকার অযৌক্তিক প্রশংসা নয়, বরং গঠনমূলক সমালোচনা চায়। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে। এ কাজে ব্যবসায়ী সমাজ ও বেসরকারি খাতের সক্রিয় সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
আলোচনায় এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান, পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাহিদী সাত্তার, অর্থনীতিবিদ ড. বজলুল এইচ খন্দকার এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজের ইজাজ বিজয়সহ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বক্তব্য দেন।
মন্তব্য (০)