নিউজ ডেস্ক : ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রতিবেশি কলম্বিয়া, কিউবাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
এর আগে শনিবার (৩ জানুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘বৃহৎ পরিসরের হামলা’ চালিয়েছে।
ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, অভিযানের পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ‘গ্রেফতার করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে’। তিনি বলেন, এই অভিযানটি ‘মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে’ পরিচালিত হয়েছে।
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটে—যা নিয়ে ভেনেজুয়েলাবাসী কয়েক সপ্তাহ ধরেই আশঙ্কায় ছিলেন।
ফক্স নিউজ ও সিবিএস নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যম আগেই জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে হামলা চালিয়েছে।
এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, ভেনেজুয়েলায় ‘নতুন ভোর’ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার জন্য এক নতুন ভোর। স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। অবশেষে সে তার অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবে।’
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসন’ চালানোর অভিযোগ করেন।
মাদুরোর সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ও জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকার যে অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে, ভেনেজুয়েলা তা প্রত্যাখ্যান, নিন্দা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ধিক্কার জানাচ্ছে।’
এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশও নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছে।
কলোম্বিয়া
এক্সে দেওয়া একাধিক পোস্টে কলোম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা হয়েছে—এ কথা সারা বিশ্বকে জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘শান্তি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান এবং জীবন ও মানব মর্যাদার সুরক্ষাই যে কোনও ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে—এই বিশ্বাস কলোম্বিয়া পুনর্ব্যক্ত করছে।’
আরেকটি পোস্টে পেত্রো বলেন, কলোম্বিয়া ‘ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন প্রত্যাখ্যান করে।’
পরে তিনি ভেনেজুয়েলা সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দেন।
কিউবা
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়ে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলায় ‘অপরাধমূলক হামলা’ চালানোর অভিযোগ তোলেন এবং জরুরি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানান।
এক্সে দেওয়া পোস্টে দিয়াস-কানেল বলেন, কিউবার তথাকথিত ‘শান্তির অঞ্চল’কে ‘নির্মমভাবে আঘাত করা হয়েছে’। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দেন, যা শুধু ভেনেজুয়েলার জনগণের বিরুদ্ধেই নয় বরং সমগ্র ‘আমাদের আমেরিকা’র বিরুদ্ধে পরিচালিত।
বিবৃতির শেষে তিনি বিপ্লবী স্লোগান উচ্চারণ করেন: ‘স্বদেশ না মৃত্যু—আমরা জয়ী হব।’
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কিউবান দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হাভানা জানায়, তারা ‘ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক হামলার নিন্দা জানাচ্ছে’। একই সঙ্গে এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘জরুরি প্রতিক্রিয়া’ দাবি করা হয়।
ইরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক হামলা এবং দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানায়।
রাশিয়া
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সংঘটিত ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ নিয়ে মস্কো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও উত্তেজনা রোধ করা এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।’
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ‘ভেনেজুয়েলাকে অবশ্যই বাইরের কোনো ধ্বংসাত্মক সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’
তারা যোগ করে, ‘ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে আমাদের সংহতি এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের নেতৃত্বের নীতির প্রতি আমাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাস জানান, তিনি ভেনেজুয়েলার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং কারাকাসে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে কালাস বলেন, ‘ইইউ ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইইউ বারবার বলেছে যে মাদুরোর বৈধতা নেই এবং তারা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে। যে কোনো পরিস্থিতিতেই আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা মানতে হবে। আমরা সংযমের আহ্বান জানাই। দেশটিতে অবস্থানরত ইইউ নাগরিকদের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
স্পেন
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলায় উত্তেজনা প্রশমিত করা, সংযম এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে মাদ্রিদ।
ইতালি
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জানান, তিনি ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ‘নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন’, একই সঙ্গে দেশটিতে থাকা ইতালীয় নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের দিকেও নজর রাখছেন।
মেলোনি বলেন, তিনি ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ইতালীয় নাগরিক বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশেরই দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে।
মন্তব্য (০)