নিউজ ডেস্ক : ভারতে সাম্প্রতিক সফরে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সন্তুষ্ট করতে যেন বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার সময়ে তিনি ভারতীয় নেতাকে ‘আশার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। ইউক্রেন পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী একটি দেশ, যাকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে ওয়ারশ।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেন, “শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে নেওয়া সব প্রচেষ্টায় আমরা সমর্থন দেব।”
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করা এবং শস্য ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে ভারত। নয়াদিল্লি সফরে যাওয়ার আগেও টাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধের বিষয়ে ভারত ‘গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে’। তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’।
তবে সফরকালে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও ইউরোপের অনেকেই আশা করছেন, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ক্রেমলিনের সঙ্গে নয়াদিল্লির যোগাযোগের সুযোগ থাকলেই যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর ভারতের প্রভাব থাকবে, এমন নয়।
‘ভারত শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না’
পোল্যান্ডে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ওয়াধওয়া বলেন, ইউরোপের চাপে ভারত নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেবে, এমন সম্ভাবনা কম। এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লি মস্কোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে তারা সংলাপ ও কূটনীতির আহ্বান জানিয়েছে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হওয়ার চাপ প্রতিহত করেছে।
এ ছাড়া নয়াদিল্লি মস্কো ও কিয়েভ, উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলেও ভারতীয় প্রচেষ্টায় কোনো পক্ষ সাড়া দেবে বা ছাড় দিতে রাজি হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
ডিডব্লিউকে ওয়াধওয়া বলেন, “যুদ্ধবিরতি ও অর্থবহ আলোচনায় উৎসাহিত করতে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগাক, পোল্যান্ড ভারতকে সেটিই করতে বলছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর নয়াদিল্লির প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করছে।”
ওয়াধওয়ার মতে, অতিরিক্ত প্রত্যাশা না করে ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, “উত্তেজনা প্রশমনে ভারত অবদান রাখতে পারে এবং আলোচনার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। তবে ভারত শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।”
রাশিয়া নিয়ে মতপার্থক্য সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে ইউরোপ
পোল্যান্ডের এই উদ্যোগ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার ইউরোপের বৃহত্তর প্রচেষ্টারও প্রতিফলন।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোপীয় অধ্যয়নকেন্দ্রের চেয়ারপারসন ও জ্যঁ মোনে চেয়ার উম্মু সালমা বাভা ডিডব্লিউকে বলেন, টাস্কের সফরের দুটি উদ্দেশ্য ছিল। একটি হলো ভারত ও তাঁর নিজ দেশের সম্পর্ক জোরদার করা, অন্যটি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিতে নয়াদিল্লিকে রাজি করানো।
বাভা বলেন, “ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ চলা সত্ত্বেও মস্কোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকায় ভারত ও ইইউর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
সম্মুখসারির দেশ পোল্যান্ড চায় না, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাশিয়া অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করুক।
বাভার মতে, এখন পর্যন্ত “উভয় পক্ষ ইউক্রেনের বিষয়টিকে অন্যান্য বিষয় থেকে আলাদা রাখতে পেরেছে” এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নিয়েছে।
তবে দুই পক্ষের মতপার্থক্য ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনে ইউরোপীয় মিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সুযোগ
পোল্যান্ডে নিযুক্ত ভারতের আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় বিসারিয়া বলেন, ভারতের অবস্থান ‘সম্ভাব্য শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীর’ ভূমিকায় পরিণত হয়েছে। কিয়েভ ও মস্কো, উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতাকে এখন কার্যকর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিসারিয়ার মতে, এমনকি ওয়ারশও এখন ‘রাশিয়া প্রশ্নটিকে’ ‘ভারত-ইউরোপ বা ভারত-পোল্যান্ড সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিরক্তির কারণ’ হিসেবে বিবেচনা করে না।
বিসারিয়া ডিডব্লিউকে বলেন, “ইউরোপ, বিশেষ করে পোল্যান্ড, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অংশীদারত্বের গভীরতা বোঝে। একইভাবে ভারতও উপলব্ধি করে, ইউরোপের বড় একটি অংশ মস্কো ও ইউক্রেন যুদ্ধকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।”
বিসারিয়ার মতে, দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনের পেছনে আংশিকভাবে রয়েছে সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অবস্থান পরিবর্তন এবং মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া। তাঁর বিবেচনায়, এর ফলে মস্কো নিয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে ইউরোপীয় সরকারগুলোর যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।
মন্তব্য (০)