নিউজ ডেস্কঃ দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা সহজলভ্য করতে হবে।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম ‘জিপে’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘জিপেতেই সমাধান’ প্রতিপাদ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে প্ল্যাটফর্মটি। এর লক্ষ্য আর্থিক লেনদেনকে আরো সহজ, নিরাপদ ও সবার জন্য সহজলভ্য করা।
সাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘জিপে’র লক্ষ্য মানুষকে অর্থ বহনের ঝুঁকি ও ভয় থেকে মুক্তি দেওয়া। এখন আর হাতে টাকা বহন করার প্রয়োজন হবে না। নোট ও কাগজপত্র নিয়ে মানুষের যে দুশ্চিন্তা থাকে, তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কাছে যে সার্ভিস নিয়ে যেতে পারব, সেখানেই সাফল্য। বড়লোকের বহু আয়োজন থাকে, কিন্তু গরিবের নেই। গরিবের জন্য যেন প্রযুক্তি থাকে, সার্ভিস থাকে, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দিতে হবে।’
গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর দিনের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তখন দেশে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত ছিল। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা এক শাখার সঙ্গে অন্য শাখার যোগাযোগেও নানা সমস্যা হতো। সেই পরিস্থিতি থেকে এখন গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যরা মোবাইলের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করতে পারছেন। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
গ্রামীণফোনের শুরুর সময়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের লক্ষ্য ছিল গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে, বিশেষ করে নারীদের হাতে মোবাইল পৌঁছে দেওয়া। সেসময় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, গ্রামের নারীরা ফোন ব্যবহার করে কী করবেন। কিন্তু পরে দেখা গেছে, এই ফোন ব্যবহার করে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে আয়ও করতে পেরেছেন।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, তখন সারাবিশ্বে বড় শহর ও বড় ব্যবসাকেন্দ্রিক সেলুলার ফোনের ধারণা প্রচলিত ছিল। কিন্তু গ্রামীণফোনের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, গ্রামের দরিদ্র মানুষকে কেন্দ্র করেও ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব। এর ফলে গ্রামীণফোনকে ঘিরে বহু কোম্পানি শহরের বাইরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে এবং গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘জিপে’কে একটি সামাজিক ব্যবসা হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের সমস্যার সমাধান করা। ‘জিপে’ যে মুনাফা করবে, তা কোনো ব্যক্তি নেবেন না; বরং সেই অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা হবে। অর্থাৎ সামাজিক ব্যবসার মধ্যেই এর সম্প্রসারণ ঘটবে।
অনুষ্ঠানে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান স্বাগত বক্তব্য রাখেন। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা দলের উপস্থিতিতে ‘জিপে’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
‘জিপে’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আহমদ আরমান সিদ্দিকী প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন সুবিধা ও ফিচার তুলে ধরে বলেন, সবার জন্য লেনদেনের জটিলতা কমিয়ে তা সহজবোধ্য করাই তাদের লক্ষ্য। আর্থিক যেকোনো জটিলতায় ‘জিপেতেই সমাধান’ পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল প্রতিশ্রুতি।
অনুষ্ঠানে প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশেষত্ব হলো- এর একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। ‘তিন শূন্য’র পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি কাজ করছে।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টাকা পে’ কার্ড তুলে দেন।
মন্তব্য (০)