রংপুর ব্যুরো : উত্তরাঞ্চলের কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি এসেছে। এরই মধ্যে তিনটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে। গবেষণা, ব্যবহারিক শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসে। সীমিত জনবল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের দ্বিতীয় সভা সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর মেয়াদে তিনটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম এর আগে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র উপদেষ্টা, বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী হল প্রভোস্টসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক রাজনীতিতেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সদস্য, এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব)-এর কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক এবং কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ গঠিত ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধবিষয়ক ছয় সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটিতেও তিনি সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভর্তি ও ওরিয়েন্টেশনের মধ্য দিয়ে। উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে কৃষি গুচ্ছের ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়টি দায়িত্ব পালন করেছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে কৃষি গুচ্ছের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ পরীক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল। ৯টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে উপস্থিতির দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় অবস্থানে ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। ইতোমধ্যে প্রথম ব্যাচের ফল প্রকাশ হয়েছে। পাশাপাশি অন্য ব্যাচগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম ও ভর্তি কার্যক্রম চলছে।
শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণায়ও আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম চালু হয়েছে। গবেষণার জন্য সাউথইস্ট ব্যাংকের বিশেষ অনুদানও পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। আউটকাম বেসড এডুকেশন (OBE) পদ্ধতির আলোকে শিক্ষার্থীদের কৃষির বাস্তব অভিজ্ঞতা দিতে এগ্রোনমি, মৎস্য চাষসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও ফিল্ড ট্রিপের আয়োজন করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নেতৃত্বের দক্ষতা বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে আলোচনা সভা ও র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে নবান্ন উৎসব ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। শীতবস্ত্র বিতরণ এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার মতো সামাজিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পাসে মাদক ও র্যাগিং প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হলের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভাষা, বিতর্ক ও স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে চালু হয়েছে বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রম। ল্যাংগুয়েজ ক্লাব শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে, ডিবেটিং ক্লাব যুক্তিভিত্তিক চিন্তা ও বিতর্কের সক্ষমতা তৈরিতে এবং স্কাউটস শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সেবার মানসিকতা গড়ে তুলতে কাজ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন, “কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, কৃষক ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে পরিকল্পিতভাবে সেগুলো কাটিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি গবেষণার আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি এবং একটি স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।”
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং দক্ষ কৃষিবিদ তৈরির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
মন্তব্য (০)