নিউজ ডেস্কঃ দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে দেশের কিশোর-কিশোরীদের দক্ষ, সচেতন, আত্মবিশ্বাসী, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত ৪ হাজার ৮৮৩টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব।
জীবনদক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সচেতনতা, নেতৃত্ব বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা, বিতর্ক, তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, সামাজিক সচেতনতা এবং নারী-পুরুষের সমতার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে এসব ক্লাবে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন বলেন, ‘দেশের কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কিশোর-কিশোরী ক্লাবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের ফলে শিশু ও কিশোরদের সামনে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি সাইবার ঝুঁকি, ভুয়া তথ্য, অনলাইন আসক্তি এবং সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, এসব বাস্তবতা মোকাবিলায় জীবনদক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, মূল্যবোধ, ডিজিটাল সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে ক্লাবগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর করা হচ্ছে। সরকার চায় দেশের প্রতিটি কিশোর-কিশোরী আধুনিক জ্ঞান, নৈতিকতা ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতের উপযোগী মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠুক।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শায়লা শার্মিন জামান বলেন, ‘মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত সারাদেশের ৪ হাজার ৮৮৩টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব শুধু একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।’
তিনি বলেন, এসব ক্লাবে নিয়মিত জীবনদক্ষতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, কৈশোরকালীন সচেতনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক চর্চা, নেতৃত্ব বিকাশ, খেলাধুলা এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার এবং ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
শায়লা শার্মিন জামান বলেন, ভবিষ্যতে প্রকল্পের কার্যক্রম আরও আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, কিশোর বয়স মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে যথাযথ দিকনির্দেশনা পাওয়া গেলে একজন কিশোর-কিশোরী যেমন আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি মাদক, সহিংসতা, অপরাধ, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি ও অন্যান্য সামাজিক অনাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখতেও সক্ষম হয়।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচালিত এসব ক্লাবে সদস্যদের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কিশোর-কিশোরী ক্লাবগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল নাগরিকত্ব, অনলাইন আচরণবিধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কিশোর-কিশোরীরা প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও আত্মউন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
কৈশোরকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, প্রজনন স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা, আত্মরক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ নিয়েও নিয়মিত সেশন পরিচালিত হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত ধারণা লাভ করছে এবং নানা বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাচ্ছে।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধেও এসব ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সদস্যদের মধ্যে আইনি সচেতনতা সৃষ্টি, শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা, পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতেও ক্লাবের সদস্যরা ভূমিকা রাখছে।
ক্লাবগুলোতে নিয়মিত বিতর্ক, কুইজ, রচনা, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, সংগীত, নাটক, বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে দেশপ্রেম, সৃজনশীলতা, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব ক্লাবে অংশগ্রহণকারী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে শিক্ষায় ঝরে পড়ার প্রবণতা কমানো, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, সামাজিক সচেতনতা ও ইতিবাচক মূল্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবার, বিদ্যালয় ও স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত কার্যক্রম তাদের সার্বিক বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে।
তারা জানান, বর্তমানে কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিকসংখ্যক কিশোর-কিশোরীকে এর আওতায় আনার পাশাপাশি ডিজিটাল দক্ষতা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, মানসিক সুস্থতা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য (০)