• শিক্ষা

১৪ বছরের শিক্ষা-যাত্রায় নতুন মাইলফলক: সেই “মজার ইশকুল” এর ৯২% শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ

  • শিক্ষা

ছবিঃ সিএনআই

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করেছিল মজার ইশকুল। তখন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া অনেক শিশুরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। কেউ ছিল পথশিশু, কেউ বস্তিতে বসবাস করত, আবার কেউ চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে থাকা পরিবারের সন্তান। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কিংবা একদিন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া—এসব ছিল তাদের অনেকের কাছেই অনিশ্চিত স্বপ্ন।

‎১৪ বছর পর সেই যাত্রায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো SSC পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মজার ইশকুলের শিক্ষার্থীরা। প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ২০ জন শিক্ষার্থী SSC পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাসের হার ৯২ শতাংশ। তবে মজার ইশকুলের জন্য এই ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়। এটি দীর্ঘ ১৪ বছরের একটি ধারাবাহিক শিক্ষা-প্রচেষ্টার প্রথম বড় ফলাফল—যে যাত্রায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটিও।

‎যাদের জন্য SSC ছিল একসময় প্রায় অসম্ভব স্বপ্ন ২০১৩ সালে মজার ইশকুলের যাত্রা শুরুর সময় প্রথম ব্যাচের অনেক শিক্ষার্থী ছিল এমন পরিবার থেকে, যেখানে প্রতিদিনের জীবনযাপনই ছিল অনিশ্চিত। কারও বাবা ছিল না, কোনো কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন মা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার সুযোগও ছিল না অনেকের। দীর্ঘদিন ধরে মজার ইশকুলের সঙ্গে তাদের পথচলা সেই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করে। ২০১৩ সালে যে শিশুরা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তাদেরই একটি অংশ এবার দেশের পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭২ শতাংশই মেয়ে।

‎মজার ইশকুলের সঙ্গে যুক্ত না হলে এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই হয়তো অল্প বয়সে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ত, শিশুশ্রমে যুক্ত হতো কিংবা পরিবারের আয়ের বোঝা বহন করতে বাধ্য হতো। কেউ কেউ বস্তির অনিশ্চিত পরিবেশে বেড়ে উঠত বা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও ছিল। তাদের জীবনে শিক্ষা তাই শুধু একটি সনদ অর্জনের সুযোগ তৈরি করেনি, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। সহজ ছিল না ১৪ বছরের পথচলা
‎মজার ইশকুলের এই পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ যাত্রায় এসেছে নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা।

‎২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি মিথ্যা মামলায় কারাবরণের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিকূলতার পাশাপাশি করোনা মহামারি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করেছে। তারপরও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সঙ্গে ধরে রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। একসময় অনেকেই বিশ্বাস করেননি যে বস্তি ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের এসব শিশু একদিন দেশের পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। শিক্ষার্থীদের অদম্য ইচ্ছা, পরিবারের সহযোগিতা, মজার ইশকুলের দীর্ঘমেয়াদি কাজ এবং দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষের সহযোগিতায় সেই অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে।

শিক্ষার পর কর্মসংস্থানেও গুরুত্ব

‎মজার ইশকুলের লক্ষ্য শুধু একজন শিশুকে স্কুলে ভর্তি করানো নয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ‘পথশিশুমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ধারাবাহিকতায় Crowne Plaza Dhaka Gulshan মজার ইশকুলের দুই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই চাকরি শুধু আয় করার একটি সুযোগ নয়; এর মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ার পাশাপাশি পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।


‎মজার ইশকুল মনে করে, একটি শিশুর জন্য শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা এমন একটি ভিত্তি তৈরি করবে, যার ওপর দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে নিজের এবং পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তন তৈরি করতে পারে।
‎নয় বছর ধরে মানিক নগর শিক্ষার্থীদের পাশে ইউনাইটেড ট্রাস্ট এই দীর্ঘ শিক্ষা-যাত্রায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ইউনাইটেড ট্রাস্ট, গত নয় বছর ধরে মজার ইশকুলের মানিকনগর শাঁখার শিক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা করে আসছে।
‎মানিকনগর শাঁখার প্রথম SSC ব্যাচের ফলাফল সেই দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পথচলারও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। এই শাখা থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, যার পাসের হার ৯২ শতাংশ। মজার ইশকুলের এই প্রথম SSC ব্যাচের সাফল্যের পেছনে তাই শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা, পরিবারগুলোর সহযোগিতা এবং বিভিন্ন ডোনার, স্পন্সর, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও শুভাকাঙ্ক্ষীর অবদান রয়েছে।

‎“এই সাফল্য একার নয়”

‎মজার ইশকুলের প্রতিষ্ঠাতা আরিয়ান আরিফ প্রথম SSC পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এই দীর্ঘ যাত্রায় পাশে থাকা সকল পরামর্শদাতা, স্পন্সর, ডোনার, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোদ্ধা, অভিভাবক এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে ইউনাইটেড ট্রাস্ট, যারা দীর্ঘ নয় বছর ধরে মানিকনগর শাঁখার শিক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে, এবং মজার ইশকুলের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া Crowne Plaza, Dhaka Gulshan-এর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

‎প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তাজদিন হাসান প্রথম ব্যাচের সকল শিক্ষার্থীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মজার ইশকুলের সঙ্গে যুক্ত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তাদের অবদানের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ৯২ শতাংশ পাস—শুরু হলো নতুন অধ্যায় মজার ইশকুলের প্রথম SSC পরীক্ষায় ৯২ শতাংশ পাসের হার প্রতিষ্ঠানটির জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই ফলাফলকে মজার ইশকুল শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখছে না। বরং এটি ২০১৩ সালে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘ যাত্রার প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষার মাইলফলক।

‎যে শিশুর জন্য একসময় স্কুলে যাওয়া ছিল অনিশ্চিত, সেই শিশুই আজ SSC পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আবার কেউ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই গল্প তাই শুধু ৯২ শতাংশ পাসের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, ধারাবাহিক ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা গেলে তারাও স্বপ্ন দেখতে পারে, পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

‎শাখাভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, আগারগাও শাঁখা থেকে ৮ জন শিক্ষার্থী SSC পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, যার পাসের হার ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে মানিক নগর শাঁখা থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং ১১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, যার পাসের হার ৯২ শতাংশ।
‎মজার ইশকুলের প্রথম SSC ব্যাচের এই অর্জন তাই ১৪ বছরের একটি স্বপ্ন, সংগ্রাম, সহযোগিতা ও ধারাবাহিকতার ফল—এবং ‘পথশিশুমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার দীর্ঘ যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

মন্তব্য (০)





  • company_logo