গাজীপুর প্রতিনিধি : মাটির নিচে গ্যাসের পাইপলাইন। আর তার ওপর ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল সীমানা-কোথাও সিমেন্টের খুঁটি, কোথাও টিনের বেড়া, কোথাও আবার পাকা স্থাপনা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি কোনো ব্যক্তিগত জায়গার স্বাভাবিক নির্মাণকাজ। কিন্তু সেই জায়গাটিই ছিল তিতাস গ্যাসের অধিগ্রহণকৃত জমি।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জাংগালিয়া ইউনিয়নের আওড়াখালী বাজারসংলগ্ন কাউলিতা গ্রামের এই চিত্র নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের পর সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর সংবাদ প্রকাশের পরই বদলে যায় পরিস্থিতি।
এবার ঘটনাস্থলে আসে তিতাস গ্যাসের লোকজন। শুধু নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ নয়, মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন উন্মুক্ত করে চিহ্নিত করা হয় প্রকৃত সীমানা। এরপর গ্যাসলাইনের ওপর থাকা স্থাপনার অংশও সরিয়ে দেওয়া হয়।
তিতাস গ্যাসের লাইনম্যান মোস্তফার ভাষ্য, স্থানীয়দের অভিযোগের পর সাংবাদিকের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। পরে সরেজমিনে গিয়ে গ্যাসলাইনের ওপর নির্মাণকাজের সত্যতা পান।
তিনি বলেন, প্রথমে মৌখিকভাবে গ্যাসলাইনের সীমানা দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সেই সীমানা মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় পরে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘ওপেন কার্ড’ করে পাইপলাইন উন্মুক্ত করা হয়। এতে প্রকৃত সীমানা স্পষ্ট হওয়ার পর গ্যাসলাইনের ওপর থাকা স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে সিমেন্টের খুঁটি, গোয়ালঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনার অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে গ্যাসলাইনের জায়গা দখল কিংবা সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।
তিতাসের লাইনম্যান মোস্তফা বলেন, “তিতাস গ্যাস লাইনের ওপর কোনো স্থাপনা করা যাবে না। জায়গাটি সবসময় উন্মুক্ত রাখতে হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, তিতাসের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা আগে থেকেই নির্মাণকাজে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাধা উপেক্ষা করেই কাজ চলছিল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অকথ্য ভাষায় গালাগালির অভিযোগও ওঠে।
তবে অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্তদের বক্তব্যও রয়েছে। ছালেকা খাতুন দাবি করেছিলেন, তিনি নিজের জমির ভেতরেই কাজ করছিলেন এবং গ্যাসলাইনের জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে মো. মোস্তফা খানও দাবি করেন, তিতাসের অধিগ্রহণকৃত জমি বাদ দিয়েই তিনি নিজের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।
এরপরও বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয় সীমানা নিয়ে প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এবার পাইপলাইন উন্মুক্ত করে সীমানা নির্ধারণের পথে যায় তিতাস।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস গাজীপুর অপারেশন ডিভিশনের ব্যবস্থাপক সাইফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, “তিতাস গ্যাসের অধিগ্রহণকৃত জমি ও গ্যাসলাইন নিরাপদ রাখা আমাদের দায়িত্ব। বিষয়টি নজরে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরেজমিনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্যাসলাইনের ওপর থাকা স্থাপনা অপসারণ করে পাইপলাইন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতেও গ্যাসলাইনের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে এ ধরনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, গ্যাসলাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি মেরামতের স্বার্থে লাইনের ওপর কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা উচিত নয়।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি সীমানাপ্রাচীর বা কয়েকটি স্থাপনা সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন-অধিগ্রহণকৃত গ্যাসলাইনের জমি কতটা নিরাপদ?
কারণ গ্যাসলাইনে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়। সেই জায়গায় যদি বসতঘর, গোয়ালঘর, প্রাচীর কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা তৈরি হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে প্রতিবন্ধকতা।
কাউলিতায় আপাতত সেই প্রতিবন্ধকতা সরানো হয়েছে। পাইপলাইন হয়েছে দৃশ্যমান, নির্ধারণ করা হয়েছে সীমানা। স্থানীয়দের মধ্যেও ফিরেছে স্বস্তি।
তবে গল্পের শেষটা এখানেই নয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, আজ স্থাপনা সরানো হলো-আগামীকাল কি আবার কেউ সীমানা অতিক্রম করবে না? তিতাসের অধিগ্রহণকৃত জমিতে নতুন করে যাতে কোনো স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি থাকবে তো?
কাউলিতার এই ঘটনায় তাই এখন স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা—সংবাদ প্রকাশের পর যে জায়গাটি উন্মুক্ত হলো, সেটি যেন আবার দখলের অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
মন্তব্য (০)