স্পোর্টস ডেস্ক : মেসি না রোনালদো? ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এবং তর্কসাপেক্ষ বিতর্কগুলোর একটি। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুই মহাতারকাকে ঘিরে অসংখ্য আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তবে এই পছন্দ-অপছন্দ কি শুধুই ফুটবলীয় পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে, নাকি এর পেছনে কাজ করে মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও?
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা সেই প্রশ্নেরই ভিন্নধর্মী উত্তর খুঁজেছে। বিশ্বের ২৬টি দেশের ১০ হাজার ৬৬১ জন মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে সমর্থকদের পছন্দের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণার ফল বলছে, যারা নিজেদের উদারপন্থী (লিবারেল) হিসেবে দেখেন, তাদের বড় একটি অংশ মেসির প্রতি বেশি অনুরাগী। অন্যদিকে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) মতাদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে রোনালদোর জনপ্রিয়তা তুলনামূলক বেশি।
গবেষকদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে দুই তারকার জনমানসে গড়ে ওঠা ভিন্নধর্মী ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মেসি সাধারণত শান্ত, বিনয়ী এবং দলগত সাফল্যকে প্রাধান্য দেওয়া একজন খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে রোনালদো আত্মবিশ্বাসী, উচ্চাভিলাষী এবং নিজের অর্জনকে দৃশ্যমানভাবে উদযাপন করতে পছন্দ করেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষ সাধারণত এমন ব্যক্তিত্বদের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়, যাদের প্রকাশ্য ইমেজ তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও সামাজিক বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দেশভিত্তিক জনপ্রিয়তার হিসাবেও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ফ্রান্স ও চীনসহ ১১টি দেশে রোনালদো জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ৮টি দেশে মেসির প্রতি সমর্থন বেশি। জার্মানি, জাপানসহ সাতটি দেশে দুই তারকার জনপ্রিয়তায় পরিসংখ্যানগতভাবে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
তবে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল ব্যতিক্রম। সেখানে সামগ্রিক জনপ্রিয়তার বিচারে মেসি রোনালদোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব তরুণদের মধ্যে বেশি দৃশ্যমান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে আসে। এছাড়া যাদের আত্মসম্মানবোধ বা ‘সেলফ এস্টিম’ বেশি, তাদের মধ্যে রোনালদোর প্রতি ঝোঁকও তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ মুখে বিনয়কে প্রশংসা করলেও বাস্তবে অনেকেই এমন ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হন, যারা নিজেদের সক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্ব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করেন। উচ্চ আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রায়ই এমন তারকাদের সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে চান এবং সেখান থেকে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি লাভ করেন।
ফলে মেসি ও রোনালদো এখন আর কেবল দুই ফুটবলারের নাম নয়। অনেকের কাছে তারা ব্যক্তিগত দর্শন, মূল্যবোধ এবং জীবনবোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। একজনকে যেখানে দলগত সাফল্য ও বিনয়ের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, অন্যজনকে দেখা হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্য, আত্মবিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হিসেবে।
চলমান বিশ্বকাপ হয়তো এই দুই কিংবদন্তির শেষ বিশ্বমঞ্চ হয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক, আবেগ এবং মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় আরও বহু বছর বেঁচে থাকবে।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘কে সেরা’—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা ছুঁয়ে যায় মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের জায়গাকেও। আর সেই কারণেই মেসি বনাম রোনালদো বিতর্কের শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
মন্তব্য (০)