• সমগ্র বাংলা

৩০ টাকায় ইতিহাসের ছোঁয়া ঈদে মা‌নিকগ‌ঞ্জের বালিয়াটি জ‌মিদার বা‌ড়িতে উপচে পড়া ভিড়

  • সমগ্র বাংলা

ছবিঃ সিএনআই

মা‌নিকগঞ্জ প্রতিনিধি : ঈদুল ফিতরের ছু‌টি‌তে ঈ‌দের আনন্দ‌কে উপ‌ভোগ কর‌তে ৩০ টাকায় ই‌তিহা‌সের ছোঁয়া নি‌তে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের ভিড় জ‌মে ছিল। দেশের অন্যতম বৃহৎ আয়তনের এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি‌কে ঘিরে আ‌শেপা‌শের পু‌রো এলাকা উৎসব মূখর হ‌য়ে উ‌ঠে‌ছে। 

মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি‌তে গিয়ে দেখা যায়, জমিদার বাড়িটির টি‌কিট কাউন্টা‌রে লম্বা লাইন ৩০ টাকা দি‌য়ে টি‌কেট কে‌টে গেট দি‌য়ে ভিত‌রে প্রবেশ কর‌ছে দর্শনার্থীরা। জ‌মিদার বা‌ড়ির বাইরে সারি সারি ব্যক্তিগত গাড়ি ও শত শত মোটরসাইকেল, আর সময় গড়া‌নোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়ছে।

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঈ‌দের ৩‌দিন প‌রেও পরিবার পরিজন নিয়ে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন দর্শনার্থীরা। মাত্র ৩০ টাকার টিকিট কেটে প্রাপ্তবয়স্করা এবং ২০ টাকায় শিশুরা পা‌চ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার ইতিহাসের ছোঁয়া। ব‌্যাপক মানু‌ষের সমাগ‌মে জ‌মিদার বা‌ড়ির সাম‌নে ব‌সে‌ছে মেলা। মেলায় অর্ধশতা‌ধিক হ‌রেক রক‌মের দোকান ব‌সে‌ছে।

জানা গেছে, অন‌্য সময় ঈ‌দের দিন ও প্রতি র‌বিবার পূর্ণ দিবস ও সোমবার অর্ধ দিবস জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি বন্ধ থা‌কে। কিন্তু এবার ঈদুল ফিতরের দিন ও প‌রের দিন র‌বিবার ও সোমবার জ‌মিদার বা‌ড়ি দর্শনার্থীদের জন‌্য খোলা রাখা হয়।

মা‌নিকগ‌ঞ্জের দৌলতপুর উপ‌জেলার নিরালী গ্রা‌মের ৫ম শ্রেণীর ছাত্র সিয়াম মা‌য়ের সা‌থে ঈ‌দের ছু‌টি‌তে ঘু‌রে বেড়া‌তে এ‌সে‌ছে বা‌লিয়া‌টি জ‌মিদার বা‌ড়িতে। তারা জ‌মিদার বা‌ড়ির বি‌ভিন্ন অং‌শে ঘু‌রে ঘু‌রে ছ‌বি তু‌লে‌ছে জানি‌য়ে জানায়, জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি দে‌খতে অ‌নেক সুন্দর, ত‌বে ভি‌ড়ের কারনে ঘু‌রে দেখ‌তে সমস‌্যা হ‌চ্ছে।

টাঙ্গাই‌লের নাগরপুরের সোহাগসহ ৪ বন্ধু জ‌মিদার বা‌ড়িতে বেড়া‌তে এ‌সে‌ছে, তারা জানায় জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টিতে ঘুর‌তে এ‌সে তা‌দের অ‌নেক ভাল লাগ‌ছে। তা‌দের ম‌তো অ‌নেক মানুষ জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি দেখ‌তে এ‌সে‌ছে, উৎসব মূখর মেলা ব‌সে‌ছে জ‌মিদার বা‌ড়ির সাম‌নে যার কার‌নে তা‌দের অ‌নেক ভাল লাগ‌ছে।

ইকবাল হো‌সেন সাভা‌রের বা‌সিন্ধা, এ বারই প্রথম বা‌লিয়া‌টি জ‌মিদার বা‌ড়িতে ঘুর‌তে এ‌সে‌ছে। তি‌নি জানান, মাত্র ৩০ টাকায় ইতিহাসের ছোঁয়া নি‌তে জ‌মিদার বা‌ড়ি‌তে এ‌সে‌ছেন তি‌নি। জ‌মিদার বা‌ড়ি‌তে ঘু‌রে তার বেশ ভাল লে‌গে‌ছে।

বা‌লিয়া‌টি জ‌মিদার বা‌ড়ি‌তে দ্বা‌য়িত্বরত কর্মচারী ‌মো: ইব্রা‌হীম জানায়, প্রতি বছ‌র ঈদ উপ‌লেক্ষে সব চে‌য়ে বে‌শি দর্শনার্থী সমাগম ঘ‌টে জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি‌তে। ঈ‌দের দিন থে‌কে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বেশ ভাল দর্শনার্থী এ‌সে‌ছে। র‌বিবার ও সোমবার বা‌দে প্রতিদিন সকাল ৯টা থে‌কে ৫টা পর্যন্ত জ‌মিদার বা‌ড়ি খোলা থা‌কে ত‌বে ঈ‌দের কার‌নে র‌বিবার ও সোমবার খোলা রাখা হ‌য়ে‌ছিল এবং প্রতি‌দিন ৬টা পর্যন্ত জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি খোলা রাখা হ‌চ্ছে।   

বা‌লিয়া‌টি প্রাসাদ জাদুঘর এর সহকারী কা‌স্টো‌ডিয়ান মুহাম্মদ নিয়াজ মাখদুম জানায়, বা‌লিয়া‌টি জ‌মিদার বা‌ড়িতে ঈদুল ফিত‌রের ছু‌টি‌তে ব‌্যাপক দর্শনার্থীদের সমাগম হ‌য়ে‌ছে। ঈ‌দের দিন শ‌নিবার জ‌মিদার বা‌ড়ি‌তে পা‌কিংসহ রাজস্ব আয় হ‌য়ে‌ছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০ টাকা, ২য় দিন র‌বিবার ১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৭০২ টাকা, ৩য় দিন সোমবার ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩১৬ টাকা রাজস্ব আয় হ‌য়ে‌ছে। মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হ‌য়ে‌ছে। সম‌য়ের সা‌থে সা‌থে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়‌ছে জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি‌তে। আগামী শ‌নিবার পর্যন্ত খোলা থাক‌বে জ‌মিদার বা‌ড়ি র‌বিবার থে‌কে র‌বিবার পূর্ণ দিবস ও সোমবার অর্ধ দিবস জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি বন্ধ থা‌কবে।

জানা গে‌ছে, ঊনিশ শতকে বাংলাদেশে নির্মিত প্রাসাদসমূহের মধ্যে বালিয়াটি জ‌মিদার বা‌ড়ি‌টি অন্যতম। ৫.৮৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত ইমারতগুলো বা‌লিয়া‌টির জমিদাররা নির্মাণ করেছিলেন। এ জমিদার পরিবারের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন গোবিন্দ রাম সাহা। তিনি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে একজন মহাজন ও লবন ব্যবসায়ী ছিলেন। জ‌মিদার বা‌ড়ির ইমারতগুলো মূলত পাঁচটি আলাদা ব্লকে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে পূর্ব দিকটি বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে। আটটি বিশালাকৃতি দ্বিতল ও ত্রিতল ইমারত একটি সুউচ্চ বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা রয়েছে। দক্ষিণের দেয়ালে চারটি সিংহদ্বার। প্রাসাদ সমূহের ১৪০x৩০০ মিটার বিশাল চত্বর ঘিরে মনোরম করিডরের স্তম্ভ সারি দিয়ে সাজানো দৃষ্টিনন্দন চারটি ইমারত দাঁড়িয়ে আছে। এদের পেছনে আরও চারটি পৃথক বিশাল আকারের ইমারত বিদ্যমান।

উত্তরে রয়েছে একটি পুকুর যার সাতটি পাকা ঘাটের সিঁড়ি পানির তলদেশ পর্যন্ত চলে গেছে। সিংহদ্বারের দক্ষিণে আরও একটি বড় আকারের পুকুর আছে। এই জমিদার বাড়িটিতে প্রায় ২০০ বিভিন্ন আকারের ও প্রকৃতির কক্ষ রয়েছে।

জমিদার বাড়ির মাঝে দ্বিতীয় ইমারতটির নাম রংমহল। এর অভ্যন্তরের দেয়াল জুড়ে রং তুলিতে আঁকা ফুল, লতা-পাতা, রঙিন জ্যামিতিক নকশায় নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে। এ ইমারতটি বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে জমিদার পরিবারের ব্যবহৃত সৌখিন আসবাবপত্র, শ্বেত পাথরের ভাস্কর্য, বেলজিয়াম আয়না, শ্বেত পাথরের টেবিল, লোহার এবং কাঠের সিন্দুক ইত্যাদি। জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকারের মধ্যে কিশোরীলাল রায়চৌধুরী, রায়বাহাদুর হরেন্দ্র কুমার রায়চৌধুরী তৎকালীন শিক্ষা খাতে উন্নয়নের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিশোরীলাল রায়চৌধুরীর পিতা এবং যাঁর নামানুসারে ওই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়। বালিয়াটির জমিদারেরা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত শতাধিক বছর বহু কীর্তি রেখে গেছেন, যা দে‌শের পুরাকীর্তিকে বিশেষ ভাবে সমৃদ্ধ করেছে।

মন্তব্য (০)





  • company_logo