আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের উত্তাল সময়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেল মার্কিন নৌবাহিনী। বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ অভ্যন্তরীণ অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে লোহিত সাগরের রণক্ষেত্র ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেরামতের জন্য রণতরিটিকে এখন গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সুদা বে নৌঘাঁটির দিকে পাঠানো হচ্ছে। গত বছরের জুন থেকে টানা প্রায় নয় মাস সমুদ্রে অবস্থান এবং সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড জাহাজটির সক্ষমতাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
জানা গেছে, গত সপ্তাহে রণতরিটির লন্ড্রি সেকশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় যা নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় লেগেছে। ধোঁয়ার কারণে প্রায় ২০০ জন নাবিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে হেলিকপ্টারে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে নাবিকদের অন্তত ১০০টি শয্যা এবং লন্ড্রি সুবিধা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। যদিও মার্কিন নৌবাহিনী দাবি করেছে যে জাহাজের ইঞ্জিন ব্যবস্থা সচল রয়েছে, তবে এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পর ৪ হাজার ৫০০ নাবিকের মনোবল এখন তলানিতে।
রণতরিটিতে কেবল দুর্ঘটনাই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত এই জাহাজের টয়লেটগুলোর ড্রেন জ্যাম হয়ে যাওয়ায় ৬৫০টি শৌচাগারের সামনে নাবিকদের দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। ২০২০ সালের এক সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই জাহাজের টয়লেট জ্যাম পরিষ্কারের জন্য প্রতিবার অ্যাসিড ফ্লাশ করতে মার্কিন সরকারের ৪ লাখ ডলার খরচ হয়।
টানা দীর্ঘ মোতায়েন এবং জাহাজের ভেতরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এই পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া সামরিক সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের নাবিকদের খাদের কিনারায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে সমুদ্রে থাকা এই ক্রুদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।” এমনকি কিছু নাবিক পরিস্থিতির চাপে পড়ে অন্তর্ঘাত বা নাশকতার আশ্রয় নিয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন নৌবাহিনী।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ -এর প্রাণকেন্দ্র ছিল এই ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। ৭৫টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এবং অত্যাধুনিক রাডার সমৃদ্ধ এই রণতরি থেকেই ইরানের ৭ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে ফোর্ডকে সরিয়ে নেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে সরিয়ে নেওয়া ফোর্ডের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে ‘ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ’। এই রণতরিটিকে বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মোতায়েন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ফোর্ডের মতো অত্যাধুনিক রণতরি কবে নাগাদ পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে ফিরতে পারবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে লোহিত সাগরের রণক্ষেত্র ছেড়ে মেরামতের গন্তব্যই এখন এই দানবীয় জাহাজের একমাত্র ভরসা।
মন্তব্য (০)