• লিড নিউজ
  • আন্তর্জাতিক

কেমন আছেন ইরানের বর্তমান ইহুদিরা?

  • Lead News
  • আন্তর্জাতিক

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক : পাশ্চাত্যে ইরানকে সাধারণত একটি ইহুদি-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হলেও, দেশটির বুক চিরে রয়েছে প্রায় ২,৭০০ বছরের পুরোনো এক সমৃদ্ধ ইহুদি ইতিহাস। 

২০১৫ সালের মার্চ মাসে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া এক ভাষণে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক চুক্তি ঠেকাতে বাইবেলের ‘এস্থার’ উপাখ্যানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেছিলেন যে ইরান ইহুদিদের জন্য এক চিরন্তন অস্তিত্বের সংকট। 

অথচ ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। পারস্যের রাজা অহশ্বেরশ বা ক্ষয়ার্শ তৎকালীন ইহুদি সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং রানী এস্থার ও তার মামাতো ভাই মর্দখয়ের স্মৃতিবিজড়িত সমাধিটি এখনও পশ্চিম ইরানের হামেদান শহরে একটি পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শাসনামলে এটিকে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

অধ্যাপক ফারহাং জাহানপুরের মতে, মধ্যপ্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের অনেক দেশের তুলনায় ইরানে ইহুদি-বিদ্বেষের ইতিহাস নেই বললেই চলে। এখানকার ইহুদিরা ইরানকে নিজেদের আদি বাড়ি মনে করেন এবং পারস্যের সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও রান্নার প্রতি গভীর নাড়ির টান অনুভব করেন। যেমনটি বলছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানি ইহুদি বংশোদ্ভূত এতান মাবুরাখ। তার পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরে হামেদানে বাস করেছেন। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর আমলে তার পরিবার ইরান ছাড়তে বাধ্য হলেও, আজও তারা ‘পাসওভার’ বা ইহুদিদের বিশেষ উৎসবে পারস্যের ঐতিহ্যবাহী রেসিপি এবং রীতিনীতি সগৌরবে লালন করেন।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে ব্যবিলনীয় নির্বাসনের সময় থেকে ইরানে ইহুদিদের আগমন শুরু হয়। রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার কর্তৃক জুডিয়ার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা প্রথমে ইসফাহানে এবং পরবর্তীতে পুরো পারস্য মালভূমিতে ছড়িয়ে পড়েন। হিব্রু বাইবেলেও প্রাচীন পারস্যের রাজাদের সঙ্গে ইহুদিদের এই নিবিড় সম্পর্কের প্রশংসা করা হয়েছে। পরবর্তীতে সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আগমন এবং বাণিজ্য পথের প্রসারের ফলে ইহুদিদের এই অভিবাসন আরও বাড়ে। 

পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিওর স্টার্নফেল্ডের মতে, ইসলামের একেশ্বরবাদী বার্তা এবং ‘আহলুল কিতাব’ বা কিতাবধারী হিসেবে স্বীকৃতি তৎকালীন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এক বড় সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল।

১৯০৬ সালে কাজার রাজবংশের আমলে সংঘটিত সাংবিধানিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ইহুদিরা দেশটির সংসদে একটি স্থায়ী আসন লাভ করে, যা তাদের মুসলিম নাগরিকদের সমকক্ষ আইনি মর্যাদা ও সুরক্ষা দেয়। এরপর ১৯২৫ সাল থেকে পাহলভী রাজবংশের অধীনে ইরান যখন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিকশিত হতে শুরু করে, তখন নাৎসি আইনের কারণে জার্মানি থেকে বিতাড়িত বহু ইহুদি বুদ্ধিজীবী এবং পেশাজীবী ইরানে আশ্রয় নেন। ১৯৪১ সালে ইরাকের ‘ফারহুদ’ দাঙ্গার পর বিপুল সংখ্যক ইরাকি ইহুদিও এখানে চলে আসেন। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইরান প্রায় তিন লাখ পোলিশ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, যাদের মধ্যে হাজার হাজার ইহুদি ছিল।

১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও ইরানের বিশাল ইহুদি জনগোষ্ঠীর মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ সেখানে পাড়ি জমায়। ১৯৬০-এর দশকে এই দেশত্যাগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, কারণ ইরান ছিল ইসরাইলের অন্যতম প্রাথমিক কূটনৈতিক ও তেল সরবরাহকারী সহযোগী রাষ্ট্র। বিনিময়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী শাহের কুখ্যাত গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’-কে প্রশিক্ষণ দিত। 

তবে শাহের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তৎকালীন বহু তরুণ ও প্রগতিশীল ইরানি ইহুদি আন্দোলনে যোগ দেন এবং সাভাকের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাবরণ বা নির্বাসন ভোগ করেন। এতান মাবুরাখের মতে, পাহলভী আমলের সেই নৃশংস নির্যাতন বর্তমান শাসনব্যবস্থার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনী একটি ঐতিহাসিক ফতোয়া জারি করেন, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে ইরানের ইহুদিরা এই জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ‘জায়নিজম’-এর সঙ্গে সাধারণ ইহুদি ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এই ফতোয়া তাদের সুরক্ষা দিলেও, বিপ্লব পরবর্তী এক দশকে প্রায় অর্ধেক ইহুদি ইরান ছেড়ে চলে যান, যাদের সিংহভাগই স্থায়ী হন আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এই সম্প্রদায়ের মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। 

আহমদিনেজাদের আমলে ইহুদি-বিদ্বেষ ও হলোকাস্ট অস্বীকারের ঘটনা সামনে এলেও, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইহুদিদের জন্য উত্তরাধিকার আইন সহজ করা এবং শনিবার ‘শাবাত’ বা বিশ্রামের দিনে ইহুদি শিশুদের স্কুলে যাওয়া থেকে ছাড় দেওয়ার মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রাণ হারানো ইহুদি সৈন্যদের স্মরণে তাঁর সরকার একটি স্মৃতিসৌধও উন্মোচন করেছিল।

বর্তমানে ইরানে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ইহুদি বসবাস করছেন, যা ইসরাইল ও তুরস্কের পর মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বৃহত্তম। তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানের মতো বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতার মাত্রা বেশ উন্নত। দেশটিতে প্রায় ৬০টি সিনাগগ, ইহুদি স্কুল, কোশার কসাইখানা এবং রেস্টুরেন্ট রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি জনসমক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশের সুযোগ না থাকলেও, তারা আধ্যাত্মিক পবিত্র স্থান হিসেবে ইসরায়েল এবং রাজনৈতিক মাতৃভূমি হিসেবে ইরানের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বজায় রাখেন।

সম্প্রতি তেহরানে ইসরাইলি বিমান হামলায় একটি সিনাগগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইরানের ইহুদি সম্প্রদায় এবং তাদের সংসদীয় প্রতিনিধি হোমায়ুন সামেহ ও ধর্মীয় নেতা রাব্বি ইউনেস হামামি লালেহজার যৌথভাবে এর তীব্র নিন্দা জানান। তারা এই হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে বলেন, ইহুদিদের সুরক্ষার বিষয়ে ইসরাইলের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমনকি ধ্বংসস্তূপ থেকে তোরাহ স্ক্রল বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো যাতে অক্ষত উদ্ধার করা যায়, সেজন্য ভারি যন্ত্রপাতির বদলে ইরানি উদ্ধারকর্মীদের হাত দিয়ে সাবধানে কাজ করার অনুরোধ সরকার রক্ষা করেছিল। এই ঘটনাটি পাশ্চাত্যের প্রচারণার বাইরে গিয়ে ইরানের ইহুদিদের প্রতি দেশটির প্রশাসনের প্রকৃত শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই।

মন্তব্য (০)





image

যে উপায়ে নীরবে ধনী হচ্ছেন লাখো আমেরিকান

নিউজ ডেস্ক : আমেরিকান স্বপ্ন বা আমেরিকান ড্রিম পূরণের চিরাচর...

image

চীন-পাকিস্তানের ‘আয়রন ব্রাদার্স’ সম্পর্ক, শান্তি কূটনীতির...

নিউজ ডেস্ক : ১৯৬৩ সালের মার্চে পাকিস্তান একটি বিরল সিদ্ধান্ত...

image

অ্যাঙ্গোলায় সোনার খনি ধসে একই পরিবারের ১৩ জন সহ নিহত ২৮

নিউজ ডেস্ক : আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলায় একটি অবৈধ সোনার খনি ধ...

image

গিনেস বুকে নাম ওঠা বিশ্বের সবচেয়ে দামি গরু, দাম শুনলে চোখ...

নিউজ ডেস্ক : গরুর দাম যে কোটি কোটি টাকা হতে পারে, তা হয়তো অন...

image

ইরানের সঙ্গে হয় অর্থবহ চুক্তি, নয়তো কোনো চুক্তিই নয়: ট্রাম্প

নিউজ ডেস্ক : ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নীতি নিয়ে য...

  • company_logo