নওগাঁ প্রতিনিধি: উত্তরের খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ। নওগাঁয় উৎপাদিত চালের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে ধান উৎপাদনে প্রসিদ্ধ উপজেলা হচ্ছে রাণীনগর। বর্তমানে সরিষার আবাদের পর উপজেলার কৃষকরা প্রধান ফসল ইরি-বোরো চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। উপজেলাজুড়ে ধান চাষের অন্যতম উপকরণ বিভিন্ন প্রকারের সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় কৃষকরা অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছেন। কিন্তু অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় অনেকটাই হতাশ কৃষকরা।
অপরদিকে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি অফিসের নিয়মিত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রাখায় উপজেলাতে সার সংক্রান্ত কোন প্রকারের অনিয়ম হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ইতিমধ্যেই দুইজন ডিলারকে বেশি দামে সার বিক্রি করার অপরাধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। এছাড়া উপজেলার প্রতিটি এলাকার প্রত্যেক সার ডিলারের কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদেও মাধ্যমে সার্বিক পর্যবেক্ষন করা হচ্ছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে। শুধু বোরো মৌসুমেই নয় উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে সারা বছরই সার বাজারের মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা: মোস্তকিমা খাতুন চৈতি।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো: জাহিদুল ইসলাম জানান উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বোরো মৌসুমে ১৮৭৯০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রবি এবং বোরো মৌসুমে রাসায়নিক সারের বরাদ্দ ছিল ইউরিয়া-৪০৮৬ মেট্রিক টন, টিএসপি-৯১৯ মেট্রিক টন, ডিএপি-২৩৭৪ মেট্রিক টন, এমওপি-১৬৫৫ মেট্রিক টন। বর্তমানে বাজারে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় ডিএপি-১০৫০ টাকা, টিএসপি ও ইউরিয়া ১৩৫০ টাকা ও এমওপি ১০০০টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। বোরো মৌসুমের জন্য বরাদ্দকৃত মোট সার প্রতি মাসওয়ারি চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। মাসওয়ারি বরাদ্দকৃত সার উপজেলা পৌঁছানো মাত্রই উপজেলা কৃষি অফিসার এবং কৃষি সম্প্রসারণ অফিসারগণ প্রতিটি বিসিআইসি এবং বিএডিসির ডিলারের দোকানে নামানোর পরে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এবং সরকারি বিধি মোতাবেক বিক্রয় অনুমতি প্রদান করে আসছে।
তিনি আরো জানান কৃষকদের মাঝে সুষ্ঠু সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত মজুদ মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। কৃষক যেন ন্যায্য মূল্যে রাসায়নিক সার পায় সেজন্য বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে দুইজন ডিলারকে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া কৃষকরা যেন প্রয়োজনের বেশি সার মজুদ না করেন এবং জমিতে কি পরিমাণ সার প্রয়োগ করা উত্তম, কিভাবে চারা রোপন করা ভালো ইত্যাদি নানা বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করে আসছে। বাজারে সার নেই, সারের সংকট, দাম বেশি ইত্যাদি এমন নানা ধরণের গুজবে কৃষকদের কান না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে যে কোন বিষয়ে কৃষকদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কিংবা সরাসরি কৃষি অফিসে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান এই কর্মকর্তা।
উপজেলার একডালা ইউনিয়নের একডালা গ্রামের কৃষক আহাদ আলী, কালিগ্রাম ইউনিয়নের ভেটি গ্রামের কৃষক মুহম্মদ আসলাম এবং সদর ইউনিয়নের খট্টেশ্বর খানপাড়া গ্রামের কৃষক মোঃ চাঁন খান জানান এবার শীতের কারণে বীজতলার তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী বীজতলার যত্ন গ্রহণ করায় রক্ষা হয়েছে। এছাড়া খোলা বাজারে রাসায়নিক সার তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যেই পাচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসারে জমিতে যখন যে সারের প্রয়োজন হচ্ছে তখন তারা বাজার থেকে সেই সার প্রয়োজন মাফিক সংগ্রহ করছেন।
উপজেলার সিংড়ারপাড়া গ্রামের আদর্শ কৃষক মোস্তাক হোসেন জানান তিনি প্রতি মৌসুমে ৪৫-৫০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করে আসছেন। বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার রয়েছে। সারের কোন সংকট নেই। তবে কিছু কৃষকরা নানা গুজবে কান দিয়ে প্রয়োজনের চাইতে অধিক পরিমাণ সার মজুদ করার কারণে কিছুটা কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। তাই সারের বিষয়ে প্রত্যেক কৃষকদেরও সচেতন হওয়া খুবই দরকার। তবে কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম কমালে আমরা কৃষকরা অনেক উপকৃত হতাম।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হাসান জানান বাজারে যেন সারের কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং অস্থিরতার সৃষ্টি করতে না পারে সেই বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ কঠোর তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া পানি সেচ নিয়ে যেন কেউ কোন অরাজকতার সৃষ্টি করতে না পারে সেই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। উপজেলাতে কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে যারা প্রপাগান্ডার সৃষ্টি করবে তাদেরকে কঠিন আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
মন্তব্য (০)