নিজস্ব প্রতিবেদকঃ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঘাড় ও কোমর ব্যথার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ ক্লাব (EUPHC) আয়োজন করে এক বিশেষ “Physiotherapy Awareness Seminar & Free Screening Camp on Prevention of Neck & Back Pain” শীর্ষক সেমিনার ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যপরীক্ষা কার্যক্রম। রবিবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজাউল হায়দার হল প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. ফরিদ এ. সোবহানী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট ডা. এম. ইয়াছিন আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিন প্রফেসর ড. মো. মাহফুজুর রহমান এবং অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রধান ড. আবু বিন ইহসান।
সেমিনারের শুরুতে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি পাবলিক হেলথ ক্লাবের পক্ষ থেকে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরপর উদ্বোধনী বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর ড. ফরিদ এ. সোবহানী বলেন, “বর্তমান যুগে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহারের অনিয়মিত ভঙ্গি এবং শারীরিক অনুশীলনের অভাব ঘাড় ও কোমর ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।” তিনি এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধে ডা. এম. ইয়াছিন আলী ঘাড় ও কোমর ব্যথার কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং আধুনিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “নেক পেইন ও লো ব্যাক পেইন এখন শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়; স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে পড়ে পড়াশোনা, অনুপযুক্ত চেয়ার-টেবিল ব্যবহার, শারীরিক কসরতের অভাব এবং মানসিক চাপও ব্যথার পেছনে ভূমিকা রাখে।”
তিনি সঠিক বসার ভঙ্গি, কাজের মাঝে নিয়মিত বিরতি, স্ট্রেচিং ও শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি ঘাড় ও কোমর ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে অস্ত্রোপচার ছাড়াই কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।
বিশেষ অতিথি প্রফেসর ড. মো. মাহফুজুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, “ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাজ করে। ফলে তাদের মধ্যে মাংসপেশি ও অস্থিসংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি বেশি। এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের সুস্থ জীবনধারায় উদ্বুদ্ধ করবে।”
সভাপতির বক্তব্যে ড. আবু বিন ইহসান জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক অঙ্গবিন্যাস এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন অনেক জটিলতা থেকে রক্ষা করতে পারে।”
সেমিনারের পরপরই শুরু হয় বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ক্যাম্প। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের ঘাড় ও কোমরের অবস্থা মূল্যায়ন, অঙ্গবিন্যাস বিশ্লেষণ এবং প্রাথমিক পরামর্শ প্রদান করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগত ব্যায়াম পরিকল্পনাও জানানো হয়। ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতালের অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টদের একটি দল এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
স্ক্রিনিং ক্যাম্পে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে ঘাড় ও কোমর ব্যথায় ভুগছিলেন কিন্তু বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সমস্যার কারণ সম্পর্কে জানতে পেরে সচেতন হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত ব্যায়াম ও সঠিক ভঙ্গি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দেন।
আয়োজক সংগঠন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি পাবলিক হেলথ ক্লাবের প্রতিনিধিরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা ভবিষ্যতেও ডায়াবেটিস, স্থূলতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা করছেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী ঘাড় ও কোমর ব্যথা কর্মক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কর্মজীবী মানুষের মধ্যে নিম্ন পিঠের ব্যথা অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও নগরায়ণ, যানজট, দীর্ঘ সময় অফিসে বসে কাজ করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়মতো সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
সেমিনার ও স্ক্রিনিং ক্যাম্পটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অংশগ্রহণকারীরা এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের কার্যক্রম তরুণ সমাজকে স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলবে এবং সুস্থ কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সার্বিকভাবে, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এই উদ্যোগ শুধু একটি সেমিনার বা স্বাস্থ্যপরীক্ষা কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি তরুণদের মধ্যে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আয়োজক ও অতিথিরা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ফিজিওথেরাপি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা গড়ে উঠবে।
মন্তব্য (১)
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
Physiotherapy is magic for pain