• আন্তর্জাতিক

যেভাবে ইসরাইলকে আরও ঘৃণ্য করে তুলছেন ট্রাম্প

  • আন্তর্জাতিক

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক অশুভ সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক বেশ নাজুক অবস্থায়। প্রথম দফার হামলার ঠিক একদিন আগে, ‘গ্যালাপের’ জরিপে দেখা গেছে যে ইসরাইল সম্পর্কে মার্কিনিদের ইতিবাচক ধারণা একবিংশ শতাব্দীর মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে; সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই প্রথম মার্কিনিরা ইসরাইলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি দেখিয়েছেন।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে মার্কিন ডানপন্থীরা। তাদের সমর্থক গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী মহলে ইহুদিবিদ্বেষের উদ্বেগজনক উত্থান কীভাবে সামলানো যায়, তা নিয়ে তারা নিজেরাই কয়েক মাস ধরে দ্বিধাবিভক্ত। রক্ষণশীল চিন্তাধারার কিছু বড় নাম ক্রমেই—এবং প্রায়শই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে—আমেরিকার যাবতীয় সমস্যার পেছনে ইসরাইলকে দায়ী করছেন।

যেহেতু মার্কিনিরা শুরু থেকেই এই যুদ্ধের ব্যাপারে বেশ সন্দিহান ছিল, তাই এটা অনুমান করতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, কিছু মানুষ ইসরাইলকে দোষারোপ করবে এবং এ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি করবে।  ঠিক সেটাই ঘটেছে। তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধের ব্যাপারে দেওয়া কিছু বক্তব্য বা বাগাড়ম্বর। ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠরা তাদের কিছু দাবির মাধ্যমে ইসরাইলের কোনো উপকার করেননি।

এখন পর্যন্ত দুটি বড় ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে যুদ্ধের বড় মোড়গুলোর জন্য প্রধানত ইসরাইলই দায়ী—যদিও উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণের বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

মার্কো রুবিওর ‘আসন্ন’ ইরানি হুমকির দাবি

প্রথমত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি ঘুরিয়ে দেওয়া যুক্তি পেশ করেছিলেন যে কেন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন হুমকি। রুবিও বলেছিলেন, ইসরাইল যাই ঘটুক না কেন ইরানে হামলা চালাবে এবং ইরান মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে তার প্রতিশোধ নেবে; সুতরাং সেই যুক্তিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক আসন্ন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ফর্মুলার রাজনৈতিক সমস্যাটি ছিল—এটি শুনতে এমন মনে হচ্ছিল যেন ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বাধ্য করছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুতই সেই যুক্তি পরিত্যাগ করে যুদ্ধের স্বপক্ষে তাদের দীর্ঘ তালিকার অন্য অজুহাতে চলে যায়।

জো কেন্টের পদত্যাগ ও অভিযোগ

গত মঙ্গলবার আমরা জানতে পারি যে, ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু বিদায়ী ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট কেবল যুদ্ধের সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হননি; তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে বাধ্য করার জন্য ‘ইসরাইল এবং তার শক্তিশালী লবির চাপকে’ সরাসরি দায়ী করেছেন।

কেন্ট তার পদত্যাগপত্রে বারবার ইসরাইলের নাম টেনে এনেছেন এবং অন্যান্য যুদ্ধের জন্যও একে দায়ী করেছেন। বুধবার টাকার কার্লসনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরাইল এবং রক্ষণশীল অ্যাক্টিভিস্ট চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বেও অংশ নেন।

এস্টাবলিশমেন্ট ডানপন্থীদের প্রতিক্রিয়া ছিল কেন্টকে একজন 'ইহুদিবিদ্বেষী উন্মাদ' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা। কিন্তু এই ব্যক্তিকেই ট্রাম্প একটি শক্তিশালী পদে বসিয়েছিলেন—এবং তা করেছিলেন শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও নাৎসি সমর্থকদের সাথে তার অতীত যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও। এখন কেন্ট সেই গ্রহণযোগ্যতা ব্যবহার করছেন ইসরাইলকে নিশানা করতে।

সাউথ পার্স হামলা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য

রাত ১০টার দিকে একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনায় বড় ধরনের ইসরাইলি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেন।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই নির্দিষ্ট হামলা সম্পর্কে কিছুই জানত না।

হামলাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতারের গ্যাস ফিল্ডে পাল্টা হামলা চালায়, যা প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। (ট্রাম্প হুমকিও দিয়েছেন যে ইরান যদি কাতারে হামলা অব্যাহত রাখে তবে তিনি ইরানের গ্যাস ফিল্ডের অংশ ‘ব্যাপকভাবে উড়িয়ে দেবেন’)। এটি বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ফিল্ড হওয়ায় এর ধ্বংসক্ষতি ইতোমধ্যে ধুঁকতে থাকা বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও সরবরাহের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রথমেই লক্ষ্য করার বিষয় হলো, ট্রাম্পের দাবিটি বিতর্কিত হয়েছে। একটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা সম্পর্কে ‘অবগত’ ছিল এবং একটি ইসরাইলি সূত্র বলেছে উভয় পক্ষ এই হামলার ব্যাপারে সমন্বয় করেছিল। (সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শ্যাপিরোসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ হামলার বিষয়ে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে জানাবে না—এটা অবিশ্বাস্য।)

এই বিতর্ক সরিয়ে রাখলেও, ট্রাম্পের মন্তব্য—রুবিওর মতোই—ইঙ্গিত দেয় যে এই উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য এককভাবে ইসরাইল দায়ী। এটি এমন এক চিত্র ফুটিয়ে তোলে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে মাত্র।

সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পারে, কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে না। বরং 'যুক্তরাষ্ট্র কিছুই জানত না'—ট্রাম্পের এই অবস্থান কেন্টের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পোষণকারীদের আরও খোরাক জোগায়।

বৃহস্পতিবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে হামলায় ইসরাইল ‘একা কাজ করেছে’। তবে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে জানত কিনা সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। নেতানিয়াহু ইসরাইল কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনার ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেন এবং সন্দেহ প্রকাশ করেন যে কেউ ট্রাম্পকে এমন কিছু করতে বাধ্য করতে পারে।

অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো

ট্রাম্প বৃহস্পতিবার তার দাবিতে অনড় থেকে সাংবাদিকদের বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ‘স্বাধীন’ কিন্তু তাদের মধ্যে ‘চমৎকার সম্পর্ক’ রয়েছে। নেতানিয়াহু সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি সমন্বিত। তবে মাঝে মাঝে সে এমন কিছু করে যা আমার পছন্দ হয় না, তাই আমরা আর তেমনটা করছি না।’

কিন্তু এই পরিস্থিতি প্রশাসনের জন্য আবারও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছে। বৃহস্পতিবার পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে রক্ষণশীল ওয়েবসাইট গেটওয়ে পন্ডিত-এর একজন সাংবাদিক প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ট্রাম্পের পোস্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ইসরাইল যদি তাদের নিজস্ব লক্ষ্য অনুসরণ করে, তবে কেন আমরা তাদের এই যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করছি?’ হেগসেথ সরাসরি উত্তর না দিয়ে অস্পষ্টভাবে বলেন, ‘তাসের চাল আমাদের হাতে। আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার। আমাদের মিত্ররাও তাদের লক্ষ্য অনুসরণ করছে এবং সত্য নিজেই কথা বলবে।’

একই দিন হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির শুনানিতে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডকে জিজ্ঞেস করা হয় যে কেন ইসরাইল (কথিতভাবে) ট্রাম্পের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবে। তিনি উত্তরে বলেন, ‘আমার কাছে এর কোনো জবাব নেই।’

ইসরাইলের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যের সঙ্গে মেলে কিনা জানতে চাইলে গ্যাবার্ড থমকে যান এবং দীর্ঘ বিরতির পর বলেন তিনি জনসমক্ষে কী বলতে পারেন তা নিয়ে ‘সতর্কভাবে ভাবছেন’। (অবশেষে তিনি স্বীকার করেন যে ইসরাইল ইরানি নেতৃত্বকে নির্মূল করার দিকে বেশি মনোযোগী, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পরমাণু এবং প্রচলিত অস্ত্র উভয় দিক থেকে নিরস্ত্র করতে বেশি আগ্রহী।)

এই শুনানিতে সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ নিশ্চিত করেন যে রুবিওর বক্তব্যের একটি গোয়েন্দা ভিত্তি ছিল। 

র‍্যাটক্লিফ বলেন, এমন প্রমাণ রয়েছে যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রান্ত হতো—সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে থাকুক বা না থাকুক।

মার্কিন জনগণের কাছে এই যুদ্ধ গ্রহণযোগ্য করা বরাবরই কঠিন ছিল এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের একটি সত্যিকারের পরীক্ষা। কিন্তু একটি সুসংগত বার্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক সুবিধাবাদী মন্তব্যের প্রবণতা এই সমীকরণকে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি জটিল করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকান সমাজ এবং ইসরাইলের সুনাম—উভয়ই এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মন্তব্য (০)





image

‘মহাবিপদের’ আশঙ্কা সৌদি আরবের

নিউজ ডেস্ক : সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান বলেছেন, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ...

image

ইরানের প্রশংসা করলেন ট্রাম্প

নিউজ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার দাবি ক...

image

যুদ্ধ বন্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শুরু: পাকিস্তান

নিউজ ডেস্ক : পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বৃহস্পতি...

image

হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশসহ ৬ দেশের জাহাজকে নিরাপত্তা দেবে...

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা ও উত্...

image

সৌদির তেল শোধনাগারে আবার ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা

নিউজ ডেস্ক : গণহত্যাকারী ইসরাইলের পাশাপাশি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে সাম্রা...

  • company_logo