রংপুর ব্যুরো : শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, আনন্দ-উৎসব ও নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। রংপুর নগরীসহ জেলার ৯৬৪টি পূজামণ্ডপে বুধবার সকাল থেকেই চলে দেবীর বিদায়পর্ব।কোথাও শেষ অর্ঘ্য নিবেদন, কোথাও সিঁদুর খেলা, আবার কোথাও প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে ভক্তদের মনে ছিল প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর বিষাদ। সেই বিষাদের মধ্যেও তাঁদের প্রার্থনায় উঠে এসেছে শান্তি, কল্যাণ, অশুভ শক্তির বিনাশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রত্যাশা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে রংপুরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে বিজয়া দশমীর পূজা সম্পন্ন হয়। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
দেবীর বিদায়লগ্নে নগরীর ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দির, কেন্দ্রীয় কালীবাড়িসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ছিল আবেগঘন পরিবেশ।নারীরা ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায় অংশ নেন।একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে বিনিময় করেন শুভেচ্ছা ও মঙ্গলকামনা। হাসি-আনন্দের এই আয়োজনেও বারবার ফিরে আসে বিদায়ের অনুভূতি। ভক্তদের প্রত্যাশা, আগামী বছর আবারও মা দুর্গা ফিরে আসবেন পৃথিবীতে শান্তি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে।
অশুভের বিনাশ, শান্তির প্রার্থনা
সনাতন ধর্মাবলম্বী মুকুল কুমার,দেবু দাস,প্রমেদি বলেন- বিজয়া দশমী শুভ শক্তির কাছে অশুভ শক্তির পরাজয়ের প্রতীক।পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুরকে পরাজিত করে দেবী দুর্গা অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়েছিলেন। তাই দেবীর বিদায় কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো এবং অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়েরও প্রতীক।
দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের প্রার্থনায় উঠে আসে মানুষের মঙ্গল ও শান্তির কথা।পৃথিবী থেকে হিংসা, হানাহানি ও অশান্তি দূর হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক মানবিকতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ-এমন প্রত্যাশা তাঁদের। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হওয়ার আশাও করছেন তাঁরা।
ভক্তদের কাছে দুর্গোৎসব শুধু পূজা-অর্চনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার উপলক্ষ। উৎসবের এই মিলনমেলা মানুষে মানুষে দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায়। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতা সবার-এই চেতনায় শান্তিপূর্ণ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
নিরাপত্তায় চার স্তরের ব্যবস্থা
এদিকে বিজয়া দশমীর পূজা, প্রতিমা বিসর্জন ও উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। পূজামণ্ডপ ও বিসর্জনস্থলে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মু. মাহবুবুর রশীদ বলেন, “ধর্মসভা ও কালীবাড়ি মন্দির এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।”
নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জনের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভক্তদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দেবী দুর্গার বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে পূজামণ্ডপের আলো নিভে গেলেও ভক্তদের মনে থেকে যাবে উৎসবের স্মৃতি, মিলনের আনন্দ আর শান্তিময় আগামী দিনের প্রত্যাশা। বিষাদের সুরে দেবীকে বিদায় জানিয়ে তাঁদের প্রার্থনা-অশুভের বিনাশ হোক, শুভ শক্তির জয় হোক, সম্প্রীতি ও মানবিকতায় সুন্দর হয়ে উঠুক সবার পৃথিবী।
মন্তব্য (০)