শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি : গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ এ তিন জেলার সীমান্তবর্তী পাঁচ থানার নদী বিল বেষ্টিত এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের রাম রাজত্ত। স্থানীয়দের দাবি, থানা সদর থেকে দূরবর্তী এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি তুলনামূলক কম থাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রভাব বিস্তার করে আসছে। চক্রটির ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না প্রাণনাশের ভয়ে। সন্ত্রাসী চক্রটির ভয়ে কেউ কেউ এলাকা ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের পাঠানটেক গ্রামের মোছলেম উদ্দিন মাস্টারের ছেলে সুমন এবং তাঁর চার ভাই খোকন, রোকন, রাজিব ও রাসেলের নেতৃত্বে ওই অঞ্চলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন। এছাড়া সুমন তালিকা ভূক্ত আইএস জঙ্গী। সুমনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। তাঁরা দাবি করেন, তাঁর নিয়ন্ত্রিত চক্রটি অত্যন্ত সংগঠিতভাবে পরিচালিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের নিজস্ব কর্মীবাহিনী।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রীপুরের বরমী ও কাওরাইদ, কাপাসিয়ার উত্তরাংশের সিংহশ্রী, রায়েদ, কপালেশ্বর, টোক, ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও পাগলা থানার দক্ষিণাঞ্চলের পাতলাশী, ইজ্জতপুর, নিগুয়ারী, ডুবাইল, বাড়ইহাটি, বরবড়াই ও তললী এবং কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ওই চক্রের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এসব এলাকায় মাদক বিক্রির অন্তত ৫০টি স্পট রয়েছে। প্রতিদিন এসব স্পটে বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয়। চক্রটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে অন্য মাদক কারবারিদের প্রবেশও কঠিন বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয়রা আরো অভিযোগ করে বলেন, সুমন বাহিনীর কয়েকটি গোপন আস্তানা রয়েছে। এসব আস্তানায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গিয়ে বিচার করা হয়। পরে নির্ধারিত অঙ্কের চাঁদা আদায়ের জন্য তাঁদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগীদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের নারী সদস্যদের নিয়ে অশালীন ও ভয়ভীতিকর দাবি করা হয় বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। এসব অভিযোগের কারণে অনেকে সম্মানহানি ও নিরাপত্তার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলে দাবি করেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি ও নির্যাতনের কারণে তাঁরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারছেন না। চক্রটির বিরুদ্ধে কথা বললে হামলা কিংবা আরও বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
বরকুল গ্রামের এক কৃষকের অভিযোগ, তাঁর কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। পরে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ওই টাকা পরিশোধ করেন তিনি। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে বর্তমানে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
নান্দিয়াসাংগুন গ্রামের এক রিকশাচালককেও তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর চাঁদা নির্ধারণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় তাঁর পরিবারের এক নারী সদস্যকে কয়েক দিনের জন্য চাওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও করেন স্থানীয়রা। এ ঘটনার পর ওই ব্যক্তি আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে তাঁদের দাবি।
বরমী বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তাঁদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হয়। তবে প্রাণভয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। অনুসন্ধানের সময় কয়েকজন ব্যবসায়ী চক্রটির নাম উল্লেখ করতেও ভয় পান।
বরনল, বাপ্তা, বরকুলসহ আশপাশের এলাকার বহু মানুষ চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের ভয়ে আত্মগোপনে বা অন্যত্র অবস্থান করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে চলা এসব কর্মকাণ্ডের কারণে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
গত বছরের ২৮ আগস্ট রাতে শ্রীপুর উপজেলার নান্দিয়াসাংগুন এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে শ্রীপুর থানার পুলিশ। তখন থানায় নেওয়ার পথে সুমনকে তাঁর সহযোগীরা কয়েক দফা হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে তিন দিন পর ঢাকায় তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে সুমনের পাঁচটি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয় এবং সেখান থেকে দেশীয় অস্ত্র ও এয়ারগান উদ্ধার করে। পুলিশের ওই অভিযানের পর কিছুদিন চক্রটির তৎপরতা কমে এলেও পরে আবারও তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের অভিযানের পর সুমনের কয়েকজন সহযোগী ও তাঁর চার ভাই আত্মগোপনে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। চক্রটির বিরুদ্ধে মুখ খোলা কয়েকজনও পরে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও সুমন বাহিনীর তৎপরতায় স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি। সুমন গ্রেপ্তার ও পুলিশের অভিযানের পর কিছু সময়ের জন্য কার্যক্রম কমে গেলেও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান পরিবর্তন করে আবার সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
সুমনের চার ভাইসহ কয়েকজন সহযোগী বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে চক্রের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়দের জানান , তিন জেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করেছে ।
নান্দিয়াসাংগুন সেতু ও আশপাশের এলাকা, গফরগাঁও ও পাগলা থানার নদী-বিলবেষ্টিত দুর্গম অঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে চক্রটির সদস্যরা অবস্থান পরিবর্তন করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ইউনিট কোনো এলাকায় অভিযান চালালে অপরাধীরা দ্রুত অন্য জেলার সীমানায় চলে যায়। যে দিক থেকে অভিযান আসে, তার বিপরীত দিকে নদী-বিল ও দুর্গম পথ ব্যবহার করে তারা পালিয়ে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে একক কোনো থানার অভিযান দিয়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করে জানান , আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য চক্রটির নিজস্ব লোকজন রয়েছে। অভিযানের আগেই খবর পেয়ে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে বলে দাবি তাঁদের। শুধু একটি থানার অভিযান দিয়ে এ চক্রের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলার সংশ্লিষ্ট থানা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে চক্রটির সদস্যদের তালিকা তৈরি এবং মাদক স্পটগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দুর্গম সীমান্তবর্তী এসব এলাকার সাধারণ মানুষ আরও বেশি সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির শিকার হতে পারেন। ভয়ভীতি কাটিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি ও অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনুর আলম জানান, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স। তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। মাদক এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপ যারা করছে তাদেরকে কোন ছাড় দেওয়া হবেনা।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, আমি এ জেলায় নতুন যোগদান করেছি, অল্প কিছুদিন হয়েছে। সুমন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
মন্তব্য (০)