প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস (World Physiotherapy Day) পালিত হয়। বিশ্বব্যাপী ফিজিওথেরাপি পেশার গুরুত্ব, ফিজিওথেরাপিস্টদের অবদান এবং মানুষের সুস্থতা ও জীবনমান উন্নয়নে শারীরিক সক্রিয়তার ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ১৯৯৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়; এই তারিখটি ১৯৫১ সালে World Physiotherapy প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য হলো— “কার্ডিওভাসকুলার রোগ ও স্ট্রোকের প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা।”
২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী চার বছরের বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসের প্রচারণায় Noncommunicable Diseases (NCDs) বা অসংক্রামক রোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই চার বছরের ধারাবাহিক প্রচারণায় হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় ফিজিওথেরাপি ও শারীরিক সক্রিয়তার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপি
কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদ্রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ হৃদ্রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব ফিজিওথেরাপির ২০২৬ সালের প্রচারণায় বলা হয়েছে, ফিজিওথেরাপিস্টরা ব্যক্তির ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করতে, নিরাপদ ও ব্যক্তিভিত্তিক ব্যায়াম কর্মসূচি তৈরি করতে এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তায় উৎসাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে কম সক্রিয়, অতিরিক্ত ওজনের, বয়স্ক অথবা হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের জন্য ব্যক্তির সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে পরিকল্পিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও ফিজিওথেরাপি শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে সহায়তা করতে পারে।
স্ট্রোক প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন
স্ট্রোক একজন মানুষের চলাফেরা, ভারসাম্য, শক্তি, সমন্বয় ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তবে স্ট্রোকের পর যথাযথ ও সময়োপযোগী পুনর্বাসন রোগীর কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্ট্রোক পুনর্বাসনে ব্যায়ামভিত্তিক ফিজিওথেরাপি রোগীর চলাফেরা, ভারসাম্য, শারীরিক সক্ষমতা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে। হাসপাতাল পর্যায় থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিটি রিহ্যাবিলিটেশন পর্যন্ত ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগীর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কেন এই দিবস গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস শুধু ফিজিওথেরাপিস্টদের সম্মান জানানোর একটি দিন নয়; এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে “নড়াচড়া করুন, সক্রিয় থাকুন, সুস্থ থাকুন”—এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আধুনিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অনিয়মিত জীবনযাপন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই প্রতিদিনের জীবনে নিরাপদ ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ফিজিওথেরাপি এখন শুধু ব্যথা বা আঘাতের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, ব্যায়াম পরামর্শ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা, হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের পুনর্বাসন এবং স্ট্রোক পুনর্বাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব
বাংলাদেশেও হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের বোঝা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষকে নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় করা, নিরাপদ ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং রোগের পর দ্রুত ও কার্যকর পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬ তাই আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—শুধু অসুস্থ হলে চিকিৎসা নয়, সুস্থ থাকতেও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সুস্থ হৃদ্যন্ত্র, সক্রিয় শরীর এবং স্বাধীন জীবন—এই লক্ষ্য অর্জনে ফিজিওথেরাপি হতে পারে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি শক্তিশালী সহযোগী।
লেখকঃ ডা. এম ইয়াছিন আলী।
চেয়ারম্যান ও চীফ কনসালটেন্ট
ঢাকা সিটি ফিজিওথোপি হাসপাতাল
ধানমন্ডি, ঢাকা। মোবাঃ ০১৭৮৭১০৬৭০২
মন্তব্য (০)