পঞ্চগড় প্রতিনিধি : পঞ্চগড়ে রাতে স্ত্রীর হাতে ভাত খাওয়ার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আলম হক (৩০)। পেটে ব্যথা ও বমি শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের জানান, তিনি বিষ খেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে পাঠানো হয় তাকে। তবে সেখানে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ দাফনও করা হয়।
এর একদিন পর স্থানীয় লোকজনের কাছে স্ত্রী মৌসুমী আক্তার (২৫) স্বামীকে ওষুধ খাওয়ানোর কথা স্বীকার করেছেন এমন অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ তাকে আটক করে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পরকীয়ার জেরে একই গ্রামের বাবুল নামের এক ব্যক্তির নির্দেশে আলমকে বিষাক্ত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের শিংরোড প্রধানপাড়া গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে। নিহত আলম হক ওই গ্রামের তোসলিম উদ্দীনের ছেলে। সোমবার বিকেলে মৌসুমিকে আটক করে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আলম ও মৌসুমীর প্রায় দশ বছরের দাম্পত্য জীবন। শনিবার রাতে স্ত্রীর হাতে ভাত খাওয়ার পর আলম হঠাৎ অস্বস্তি বোধ করেন। কিছুক্ষণ পর পেটে ব্যথা ও বমি শুরু হয়। এ সময় পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি বিষ খাওয়ার আশঙ্কার কথা জানান।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পরে পানি খাওয়ানোর কথা বলে শরবতের সঙ্গে আরও ওষুধ মিশিয়ে আলমকে খাওয়ানো হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে নেওয়ার পরামর্শ দেন। রংপুরে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
পরদিন রোববার পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পঞ্চগড় সদর থানায় জানানো হয়। পুলিশ মরদেহের ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। ময়নাতদন্ত শেষে আলমের মরদেহ নিজ এলাকায় দাফন করা হয়।
তবে দাফনের পর সোমবার স্থানীয় লোকজনের কাছে মৌসুমী তার স্বামীকে ওষুধ খাওয়ানোর কথা স্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ করেন নিহতের স্বজনেরা। তাদের দাবি, একই গ্রামের বাবুলের নির্দেশেই মৌসুমী আলমকে ওই ওষুধ খাওয়ান। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন জড়ো হন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মৌসুমীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
মৌসুমী আক্তার জানান, বাবুল নামের এক ব্যক্তি প্রায় এক বছর ধরে তাকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করতেন। মুঠোফোনে কল করার পাশাপাশি ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে দেখা করার জন্য চাপ দিতেন।
মৌসুমীর ভাষ্য, আলমকে খাওয়ানোর জন্য বাবুল তাকে ওষুধ দিয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, সেটি ঘুমের ওষুধ; এতে কোনো সমস্যা হবে না। ওষুধ না খাওয়ালে তার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়েছিল। এ ভয়ে তিনি স্বামীকে ওই ওষুধ খাওয়ান বলে দাবি করেন।
নিহত আলম হকের বড় ভাই আব্দুল করিম বলেন, আমি আলমের স্ত্রীকে বলেছিলাম, তুমি যদি কিছু করে থাকো, তাহলে আমাকে বলো। তোমার বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করব। কিন্তু এরপরও সে কিছু বলতে রাজি হয়নি। পরে সে আমাদের এক ভাগিনা মকছেদুলকে জানায়, বাবুলের সঙ্গে তার এক বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। তারা দুজন পরামর্শ করে আমার ভাইয়ের খাবারে বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়। পরে শরবতের সঙ্গেও বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আমার ভাইকে এভাবে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। সে যদি অন্য কারও সঙ্গে চলে যেতে চাইত, তাহলে চলে যেতে পারত। কিন্তু আমার ভাইকে মেরে ফেলল কেন? আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
আলমের ছোট বোন বলেন, আমার ভাবি আমার ভাইকে এভাবে বিষ খাইয়ে মারবে, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। সে অন্য কারও সঙ্গে চলে যেতে চাইলে চলে যেতে পারত। কিন্তু আমার ভাইকে মেরে ফেলল কেন? আমরা এর বিচার চাই।
পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোখলেছুর রহমান বলেন, আলমের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। গতকাল পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছিল। আজ স্থানীয় লোকজন ফোন করে জানান, আলমের স্ত্রী ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মৌসুমী আক্তারকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
মন্তব্য (০)