নিউজ ডেস্ক : যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আরও কঠোর অভিবাসন আইন আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত আইনে, আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় খরচে থাকা-খাওয়ার জন্য ব্যয় করা অর্থের অংশ হিসেবে প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা) পরিশোধ করতে হবে। এ অর্থ পরিশোধ না করলে তারা স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি (সেটেলমেন্ট) পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উপস্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন এই আয়ভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থা অভিবাসন ও আশ্রয় আইন -এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে শিক্ষা ঋণ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার ও শরণার্থী সহায়তা সংস্থা এর তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধ, নির্যাতন ও দুর্ভিক্ষ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ওপর এটি কার্যত অতিরিক্ত কর আরোপের শামিল।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প থেকে সরকারের আয় খুবই সীমিত হবে। কারণ আশ্রয় পাওয়ার পাঁচ বছর পরও শরণার্থীদের ১৫ শতাংশেরও কম বছরে ২০ হাজার পাউন্ডের (প্রায় ৩২ লাখ টাকা) বেশি আয় করেন।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন ও সহায়তায় বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হওয়ায় সরকার তীব্র চাপের মুখে রয়েছে।
শাবানা মাহমুদ বলেন, আশ্রয় সহায়তা পাওয়া একটি অধিকার, তবে এটি একই সঙ্গে একটি দায়িত্বও। মানুষ যখন আয় করতে সক্ষম হবে এবং ব্রিটিশ জনগণের উদারতার প্রতিদান দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করবে, তখন আমরা তাদের কাছ থেকে সেই অবদান প্রত্যাশা করি।
হোম অফিস জানিয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের মোট প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড ফেরত দিতে হবে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজন অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ পরিবর্তন করতে পারবেন।
২০২৩ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশের বার্ষিক আয় ছিল ২০ হাজার পাউন্ড বা তার বেশি। বাকিরা হয় কর্মহীন ছিলেন, নয়তো এর চেয়ে কম আয় করছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের জাতীয় জীবিকা নির্বাহযোগ্য মজুরি বছরে প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ডের সামান্য কম।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির পরিচালক ম্যাডেলিন সাম্পশন বলেন, তথ্য-উপাত্ত বলছে, ন্যূনতম মজুরির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম সীমা নির্ধারণ না করলে খুব অল্পসংখ্যক শরণার্থীই এই প্রকল্পে অর্থ পরিশোধের মতো আয় করবেন।
তিনি বলেন, এটি খুব কম আয়ের মানুষের জন্য আয়ভিত্তিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা হওয়ায় সরকারি অর্থনীতিতে এর প্রভাবও তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে। তার মতে, এই প্রকল্প সফল আশ্রয়প্রার্থীদের কাজ খুঁজে নিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আবার কেউ কেউ অর্থ পরিশোধ এড়াতে বিকল্প আবাসনের দিকেও ঝুঁকতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, এই পরিকল্পনার ফলে কেউ হয়তো সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে না থেকে অন্য সহায়তার চেষ্টা করবেন। আবার শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পর বেশি কার্যকর করহার দিতে হবে ভেবে কাজ করতেও অনীহা তৈরি হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান হোম অফিসের কাছে প্রকল্পটির পূর্ণ ব্যয়, আয়সীমা ও কোন পর্যায় থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের অর্থ পরিশোধ শুরু করতে হবে- এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল।
হোম অফিসের একজন মুখপাত্র বলেন, আয়সীমাসহ বিস্তারিত বিষয়গুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের বিধিমালায় নির্ধারণ করা হবে। এসব চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এদিকে, প্রস্তাবিত ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল-এ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৮ অভিবাসন ও বহিষ্কারসংক্রান্ত মামলায় কীভাবে প্রয়োগ হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি অভিবাসীদের বয়স নির্ধারণ প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া, আধুনিক দাসত্ব (Modern Slavery)-সংক্রান্ত আইনি কাঠামোও সংশোধন করা হবে, যাতে দেরিতে দাবি উপস্থাপনের প্রবণতা বন্ধ করা যায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মন্তব্য (০)