নিউজ ডেস্ক : অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবচেয়ে বড় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে হরমুজ প্রণালিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক হামলার পর শনিবার (২৭ জুন) সেখানে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা।
দুই সপ্তাহ আগে চার মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে চুক্তি হয়েছিল, তার পর এই ঘটনাকে সবচেয়ে মারাত্মক সামরিক উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধরত দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা রাতভর ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে শনিবার তারা মার্কিন বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।
ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার আক্রান্ত হওয়া ট্যাংকারটির ব্রিজের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর সব ক্রু নিরাপদ রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নৌবাহিনীর আন্তর্জাতিক জোটের পরিচালিত যৌথ সামুদ্রিক তথ্য কেন্দ্র ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্দিষ্ট কোনো জাহাজে হামলার বিষয়ে ইরান সরাসরি মন্তব্য না করলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, রেভল্যুশনারি গার্ডস তাদের অনুমোদিত চ্যানেল ব্যবহার না করা অজ্ঞাত কিছু জাহাজের উদ্দেশ্যে ‘সতর্কতামূলক গুলি’ বর্ষণ করেছে। এর ফলে অন্যান্য জাহাজগুলো এখন প্রণালি অতিক্রম করার আগে ইরানের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক সদর দফতর অবস্থিত বাহরাইন তাদের ভূখণ্ডে ইরানি ড্রোন হামলার খবর দিয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তারা নিন্দা জানিয়েছে।
ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অন্তর্বর্তী চুক্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন মিত্র ইসরাইল গত মার্চ মাসে লেবাননে যে আক্রমণ চালিয়েছিল, সেখানে প্রতিশ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে পারেনি ওয়াশিংটন। যদিও শুক্রবার (২৬ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে নতুন করে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত।
ইসরাইল তাদের দখলকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, অন্যদিকে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরাইলি সেনা থাকা পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণে রাজি নয়। এর মধ্যেই শনিবার দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি করে যুদ্ধ সমাপ্তির সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, বন্দর নগরী সিরিকের একটি যোগাযোগ টাওয়ারে মার্কিন হামলার পর রেভল্যুশনারি গার্ডস এর জবাব দিয়েছে, তবে বন্দরের মূল অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শত শত তেলবাহী ট্যাংকার ও জাহাজ পারস্য উপসাগরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। গত দুই সপ্তাহে চুক্তি অনুযায়ী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী পর্যায়ে নেমে আসে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য এই প্রণালি দিয়ে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন দ্বি-পাক্ষিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ওয়াশিংটন ওমানের উপকূল ঘেঁষে একটি দক্ষিণ লেন ব্যবহারের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, যেখানে তেহরান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উত্তর রুটটি ব্যবহারে বাধ্য করতে চাইছে এবং ভবিষ্যতে এর জন্য ফি আদায় করার পরিকল্পনা করছে। ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের শিপিং নির্দেশনার যেকোনো লঙ্ঘন কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, আমেরিকা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলেছে এবং এর পর যেকোনো সংঘাতের জন্য ইরানই দায়ী থাকবে। সহিংসতাকে সহিংসতার মাধ্যমেই জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
অতীতেও সপ্তাহের শেষভাগে যখন আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ থাকে, তখন এমন রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তৈরি হতে দেখা গেছে। সাধারণত শনি ও রোববারের তীব্র বাগাড়ম্বর শেষে সোমবার বাজার খোলার আগেই দুই পক্ষ কিছুটা নরম অবস্থানে ফিরে আসে। নতুন করে এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আগে, শুক্রবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তবে রোববারের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত না হলে সোমবার বাজার খোলার সাথে সাথে তেলের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স।
মন্তব্য (০)