লাইফস্টাইল ডেস্ক: আজ ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের কোটি কোটি শিশুকে শ্রমের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করার আহ্বান নিয়ে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়। জাতিসংঘের এ বছরের প্রতিপাদ্য— ‘শিশুশ্রমকে লাল কার্ড দেখান, শিশুদের জন্য ন্যায্য সুযোগ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ।’
জাতিসংঘের শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনও প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য বড় হুমকি। যদিও ২০০০ সালে শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ কোটি ৬০ লাখ, তারপরও বর্তমান অগ্রগতির হার শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র এখনো কৃষিখাত। বিশ্বের মোট শিশুশ্রমের ৬১ শতাংশ শিশু কৃষিকাজে নিয়োজিত। এছাড়া ২৭ শতাংশ শিশু বিভিন্ন সেবামূলক কাজে এবং ১৩ শতাংশ শিশু শিল্প খাতে কাজ করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশুশ্রম রয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোতে। সেখানে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ শিশু শ্রমে জড়িত। অন্যদিকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গত কয়েক বছরে শিশুশ্রমের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এদিকে বাংলাদেশে শিশুশ্রমের একটি বড় অংশ গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের ঘিরে। দেশে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও শোষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন অনুযায়ী গৃহকর্মকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে এটি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের ২০২৪ সালের ‘ঢাকা শহরের শিশু গৃহকর্মীদের পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫২ জন শিশু গৃহকর্মীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত কাজের চাপ, শারীরিক নির্যাতন, গালাগালি এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনাও পাওয়া গেছে।
একই গবেষণায় দেখা যায়, অনেক শিশুকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাদের মজুরি সরাসরি শিশুর হাতে না গিয়ে অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৫ লাখ শিশু গৃহকর্মী বর্তমানে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। সংগঠনটির মতে, গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করায় এসব শিশু যথাযথ সুরক্ষা পাচ্ছে না।
গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিশু গৃহশ্রমকে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ শিশুদের শ্রমে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম বন্ধে শুধু আইন নয়, দরকার দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান— প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ শিশুর হাতে বইয়ের বদলে শ্রমের বোঝা তুলে দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি শিশু নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
মন্তব্য (০)