নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ‘ফ্রন্টলাইন টু ফিউচার’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি), ঢাকায় শুরু হয়েছে ২০ তম বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পসংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নিচ্ছেন, যেখানে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ডেনিম ও পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, প্যাসিফিক জিন্সের পরিচালক লুথমেলা ফারিদ, বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল, ইন্ডিটেক্সের বাংলাদেশ ও পাকিস্তান অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান হাভিয়ের সান্তোনহা ওলসিনা, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের প্রধান মাইকেল মিলার, এবং বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজ উদ্দিন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন অধ্যায় নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের দিকে এমন একটি দেশ হিসেবে তাকিয়ে আছে, যা তার অর্থনৈতিক যাত্রার নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, উচ্চমানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর নিশ্চিত করা এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ করা।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একটি সাহসী ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক বাজেট প্রত্যাশা করি, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপারেটরদের জন্য সমান সুযোগের পরিবেশ নিশ্চিত করবে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”
রাষ্ট্রদূত মিলার আরও জানান, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিতব্য আগামী গ্লোবাল গেটওয়ে সামিটে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সদ্য শুরু হওয়া পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সংক্রান্ত অনুরোধ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যালোচনা করছে, যা বাংলাদেশের সঙ্গে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিরই বহিঃপ্রকাশ।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বৈশ্বিক ডেনিম বাণিজ্যে বাংলাদেশের অর্জনের কথা তুলে ধরে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় বাজারেই ডেনিম রপ্তানিতে চীনের চেয়ে এগিয়ে এবং শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এই অর্জনের পেছনে বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি একমাত্র কারণ নয়, তবে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এলডিসি উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। ঢাকার প্রতিটি বোর্ডরুম ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজিএমইএর অবস্থান স্পষ্ট—উত্তরণের পর বর্তমানে যে বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো আমরা পাচ্ছি, তা পরিবর্তিত হবে। আমরা যদি প্রস্তুত না থাকি, তবে শিল্পখাত এর প্রভাব অনুভব করবে। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতই অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। কিন্তু যথাযথ বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে এই শিল্পই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। তবে এর আগেও আমরা নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি এবং সামনে এগিয়ে গেছি। এবারও পারব। এলডিসি উত্তরণ, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কোনো একক পক্ষের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের আমাদের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে, শুধু নিরীক্ষক হিসেবে নয়। উন্নয়ন সহযোগীদের শুধু পরামর্শ নয়, বিনিয়োগ নিয়েও এগিয়ে আসতে হবে। একইভাবে সরকারকেও শুধু নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নয়, সহযোগীর ভূমিকায় থাকতে হবে।”
বাণিজ্য ও জাস্ট ট্রানজিশন নিয়ে দুটি প্যানেল আলোচনা: এক্সপোর প্রথম দিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
‘নেগোশিয়েটিং দ্য ফিউচার: ট্রেড এগ্রিমেন্টস অ্যান্ড বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইন দ্য পোস্ট-এলডিসি এরা’ শীর্ষক প্রথম আলোচনায় অংশ নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (পূর্ব ও পশ্চিম) সচিব ড. মো. নজরুল ইসলাম; বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মিশনপ্রধান খন্দকার মাসুদুল আলম (ভার্চুয়ালি); বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন বাইবা জারিনা; আনন্ত গ্রুপ ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির; এবং টিম গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবদুল্লাহ হিল নাকিব। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ।
দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনা ‘স্টিচিং দ্য ফিউচার: জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ’স অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রি’-তে অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান; আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনিওন; অরাম সুয়েটার লিমিটেডের পরিচালক আমের সালিম; জিআইজেড-এর স্টাইল (STILE) II প্রকল্পের প্রধান ড. মাইকেল ক্লোডে; এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন লডস ফাউন্ডেশনের হেড অব ক্রস-ইন্ডাস্ট্রি প্রোগ্রাম নওরীন চৌধুরী।
এক্সপোতে একটি বিশেষ ‘ট্রেন্ড জোন’ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ডেনিম শিল্পের সর্বশেষ উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রবণতাগুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
২০তম বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো আগামী ১১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত আইসিসিবি, ঢাকায় চলবে।
অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ ভিডিও রেকর্ডিং দেখা যাবে: https://www.youtube.com/live/3-FpNJou27k
মন্তব্য (০)