নিউজ ডেস্ক : ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের শোচনীয় পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘অটোপ্সি রিপোর্ট’ বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।
তবে গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) জনসমক্ষে আসা ১৯২ পৃষ্ঠার এই পর্যালোচনা নথিতে অসংখ্য ভুলত্রুটি, খামতি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপস্থিতি দেখা গেছে। এমনকি মার্কিন রাজনীতি ও বিশ্বমঞ্চে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করা গাজা যুদ্ধ ও ইসরাইল নীতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি এই পুরো প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মী ও মানবাধিকার কর্মীদের চাপের মুখে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। ডিএনসি চেয়ারম্যান কেন মার্টিন রিপোর্টের দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতার কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, এই প্রতিবেদনটি আমার বা আপনাদের কারো মানদণ্ডই পূরণ করতে পারেনি। এর ভেতরের অনেক দাবি এবং যা যা বাদ পড়েছে, তার কোনোটিই আমি সমর্থন করি না। তবে স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই অপরিবর্তিত অবস্থায় এটি প্রকাশ করা হয়েছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের এই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে ৫টি মূল বিষয় উঠে এসেছে:
গাজা প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ নীরবতা
নির্বাচনের আগে জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিস প্রশাসনের ইসরাইলপন্থী একমুখী নীতি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল ও তরুণ ভোটারদের বড় অংশকে ক্ষুব্ধ করেছিল। গাজায় ইসরাইলি হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু এবং দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে বাইডেন প্রশাসনের প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা ও জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো প্রদান কমলার জনপ্রিয়তায় ধস নামায়। বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা গেছে, ২০২০ সালে বাইডেনকে ভোট দেওয়া বহু ভোটার গাজা ইস্যুতে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০২৪-এ কমলাকে ভোট দেননি।
অথচ, এই ১৯২ পৃষ্ঠার দীর্ঘ রিপোর্টে ‘গাজা’ বা ‘ইসরাইল’ শব্দটির একবারও উল্লেখ নেই। কমলার ডেপুটি ক্যাম্পেইন ম্যানেজার রব ফ্লাহার্টিও পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে গাজা ইস্যুটি তাদের গলায় একটি ‘পচা মাছের’ মতো ঝুলে ছিল, যার কোনো সদুত্তর প্রচার শিবিরের কাছে ছিল না।
নিখোঁজ অংশ, ভুল তথ্য ও টীকা-টিপ্পনী
প্রতিবেদনটি এতটাই তাড়াহুড়ো ও দায়সারাভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এর ‘এক্সিকিউটিভ সামারি’ (সারসংক্ষেপ) এবং ‘কনক্লুশন’ (উপসংহার)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুরোপুরি গায়েব। সেখানে কেবল ‘পেন্ডিং’ (অপেক্ষমাণ) লিখে রাখা হয়েছে। এছাড়া নথিতে এমন কিছু দাবি করা হয়েছে যা জনসমক্ষে থাকা তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন— ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা তিনটি গভর্নর পদে জিতলেও রিপোর্টে বলা হয়েছে দুটি। আবার মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া ও উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যগুলো ডেমোক্র্যাটদের নিশ্চিত ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ২০১৬ সালে এই রাজ্যগুলোতেই ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। রিপোর্টের এই ত্রুটিগুলোর পাশে ডিএনসি-র পক্ষ থেকে ‘দাবিটি যাচাই করা যায়নি’ বা ‘প্রকাশিত তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক’ এমন অসংখ্য টীকা জুড়ে দিতে হয়েছে।
জো বাইডেনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাব
রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, জো বাইডেনের হোয়াইট হাউস কমলা হ্যারিসকে রাজনৈতিকভাবে গড়ে তুলতে বা কৌশলগত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেনের প্রচারণায় নামার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা বিস্তর জরিপ ও গবেষণা করলেও, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলার ক্ষেত্রে তেমন কিছুই করা হয়নি। উপরন্তু, কমলার ওপর অভিবাসনের মূল কারণ অনুসন্ধানের মতো একটি বিতর্কিত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে রিপাবলিকানরা সহজেই তাকে ‘বর্ডার জার’ বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রক আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করার সুযোগ পায়। হোয়াইট হাউস সময়মতো কমলাকে সঠিক রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি দিলে এই বিপর্যয় এড়ানো যেত বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
‘শুধু ট্রাম্প-বিরোধী’ কৌশলের ব্যর্থতা
কমলা হ্যারিসের প্রচার শিবিরের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল, তারা মার্কিন জনগণের সামনে নিজেদের কোনো সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ রূপরেখা বা ভিশন তুলে ধরতে পারেনি। তাদের পুরো প্রচারণা আবর্তিত হয়েছে ‘ট্রাম্পকে ঠেকাতে হবে’ এবং ‘অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনজীবী’— এই সরল সমীকরণকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের অধীনে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত সাধারণ ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের এই চেনা নেতিবাচক দিকগুলো ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট অনুপ্রেরণা জোগাতে পারেনি। ট্রাম্পের অতীত ব্যর্থতা ও অযোগ্যতার বিষয়গুলো ভোটারদের সামনে কার্যকরভাবে তুলে ধরতেও এই প্রচারণা ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রান্সজেন্ডার বিজ্ঞাপনে কোণঠাসা কমলা
নির্বাচনী প্রচারণার শেষলগ্নে ট্রাম্প শিবিরের একটি অত্যন্ত কার্যকর বিজ্ঞাপন কমলা হ্যারিসের প্রচারণাকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলেছিল। কারাবন্দী হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডারদের রাষ্ট্রীয় খরচে লিঙ্গ পরিবর্তন অস্ত্রোপচারের সুবিধা দেওয়ার পক্ষে কমলার একটি পুরনো বক্তব্যকে ব্যবহার করে ট্রাম্পের দল স্লোগান দেয়— ‘কমলা তাদের জন্য, আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনার জন্য।’ ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ জরিপকারীরাও স্বীকার করেছেন, এই একটি বিজ্ঞাপন কমলার অর্থনৈতিক নীতি ও অগ্রাধিকারকে ভোটারদের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল। কমলা নিজের অবস্থান পরিবর্তন না করায় এই মোক্ষম আক্রমণের কোনো মানানসই জবাব ডেমোক্র্যাটরা দিতে পারেনি।
সূত্র: আল-জাজিরা।
মন্তব্য (০)