নিউজ ডেস্ক : জাতীয় সংসদে মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নব নিযুক্ত সদস্যরা অফিসে যাচ্ছেন না। এতে কমিশনের কার্যক্রমে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে অভিযোগের নিয়মিত তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম থমকে গেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধ্যাদেশ বাতিলের পর গত ৯ এপ্রিল কমিশনের সদস্যরা অফিস থেকে অনানুষ্ঠানিক বিদায় নেন। এ সময় তারা দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতার কথা উলেখ করেন। পরে সোমবার তারা একটি খোলা চিঠি লিখে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। এতে এই অধ্যাদেশ বাতিলে বর্তমান সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরি সোমবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে অধ্যাদেশ বাতিলের পর কমিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। সঙ্গত কারণেই আমরা আর কমিশন কার্যালয়ে যাচ্ছি না। এখানে আমাদের পদত্যাগের কোনো প্রশ্ন নেই।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উলেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বলা হচ্ছে-ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ এখন পুনরায় চালু হলো। এতদিন যা আমলাতন্ত্রের অধীনে সরকারের আজ্ঞাবহ ‘পরাধীন কমিশন’ হিসাবে সমালোচিত হয়ে আসছে।
জুলাই অভুত্থানের পর অন্তবর্তী সরকারের আমলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রনীত হয়। এতে কমিশনকে সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। পরে জারিকৃত অধ্যাদেশের অধীনে মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। এতে সদ্য বিলুপ্ত গুম কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন সদস্যকে নবগঠিত কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়।
খোলা চিঠি: সোমবার বিদায়ী কমিশনের সদস্যরা যে খোলা চিঠি দিয়েছেন তার শুরুতে লেখা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন ‘এখন আমাদের কী হবে?’ তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।’ ‘কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।’
এতে আরও বলা হয়, ‘সংসদে বলা হয় যে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর কারাদণ্ড, অথচ গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ পাস করে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও প্রকৃত অর্থে ভবিষ্যতে জুলাই যোদ্ধারা মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।’
কমিশনের সদস্যদের দাবি, সংসদীয় বিশেষ কমিটির যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংসদে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে, তাতে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হবে। এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে আসবে।
চিঠিতে বিদায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদ্য সাবেক কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস রোববার যুগান্তরকে বলেন, অন্তবর্তী সরকারের যে অধ্যাদেশের অধীনে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সেটি আর নেই। ফলে মানবাধিকার কমিশনে তাদের থাকার আর সুযোগ ছিল না। এ কারণে তারা সেখান থেকে সরে এসেছেন। তবে তিনি মনে করেন অধ্যাদেশটি আইনে পরিনত হলে ভালো হত। খোলা চিঠিতে তারা এসবের পরিষ্কার ব্যখা দিয়েছেন।
মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগের পর দীর্ঘদিন কমিশনে অচলাবস্থা চলেছে। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলামের নেতৃত্বধীন ৫ সদস্যের কমিশন দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এতে অনুসন্ধান এবং তদন্তসহ দাপ্তরিক কাজে পূর্ণাঙ্গ গতি ফিরে আসে। কিন্তু ৯ এপ্রিল কমিশন সদস্যরা এক জরুরি সভা ডেকে অফিস থেকে অনানুষ্ঠিক বিদায় নেন। পরদিন থেকে তারা আর অফিসে আসবেন না বলে জানিয়ে দেন।
জানা যায়, বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি অভিযোগ পেন্ডিং অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু কমিশনারদের অনুপস্থিতিতে এসবের নিস্পত্তি হচ্ছে না। এছাড়া শুনানিসহ দাপ্তরিক কার্যক্রমেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। নীতি নির্ধারনি অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
মন্তব্য (০)