নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সংবাদ মাধ্যমের আলোচনা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে আজাদি, ইনকিলাব, বয়ান, বন্দোবস্তের মতো কিছু শব্দ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসছে।
কেউ কেউ তাদের বক্তৃতা কিংবা কথায় এসব শব্দ বেশ জোর দিয়ে প্রয়োগ করছেন, আবার কেউ কেউ দাবি করছেন প্রচলিত শব্দ ব্যবহার না করে এসব শব্দ এখন ইচ্ছে করে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে।
এ বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এসব বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলোও মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। একজন মন্ত্রী বলেছেন, এসব শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষারই সম্পর্ক নেই।
এখন প্রশ্ন উঠছে যে নতুন করে যেসব শব্দ আলোচনায় এসেছে সেগুলো কী ভাষার বিকৃতি ঘটাচ্ছে? কিংবা এগুলো কী একেবারেই নতুন? কেনই বা এসব শব্দ সামনে আসছে? যারা এসব শব্দ নিয়ে আপত্তি করছেন তাদের আপত্তিরই বা কারণ কী?
তবে ভাষাবিদরা বলছেন, এসব শব্দ ভাষার বিকৃতিও ঘটাচ্ছে না আবার এগুলো বাংলা ভাষার জন্য কোনো ধরনের হুমকিও নয়।
তাদের মতে, এগুলো রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে এখন আলোচনায় আসছে, কারণ বাংলাদেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন কথা বলা, লেখা কিংবা চিন্তার ক্ষেত্রে এসব শব্দ সাধারণত খুব কমই ব্যবহার করেন।
প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষার শব্দ বাংলা ভাষায় যুক্ত হওয়ার কারণে এটিকে অনেকে একটি ‘মিশ্র ভাষা’ বলতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে ইংরেজি, আরবি ও ফারসিসহ বিভিন্ন ভাষার অনেক শব্দই বাংলা ভাষায় একীভূত হয়েছে।
অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট, ইউনিয়ন ইত্যাদি বিদেশি শব্দ একীভূত হয়ে গেছে, তেমনি ইত্তেফাক, ইনকিলাবের মতো শব্দ দিয়ে জাতীয় পত্রিকার নামকরণও হয়েছে।
যেসব শব্দ আলোচনায়
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ইনকিলাব শব্দ নিয়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীদের নেতাদের অনেকের মুখেই শোনা গেছে ‘আজাদি, বন্দোবস্ত, বয়ান, ইনসাফ, ফয়সালা, মজলুম’ এর মতো শব্দগুলো।
সভা সমাবেশে কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে আলোচনায় তারা এসব শব্দ অনেক বেশি ব্যবহার করছেন বলে অনেকের দৃষ্টিতে এসেছে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেক অনুসারী রয়েছে, এমন কাউকে কাউকে এ ধরনের শব্দ বেশি ব্যবহার করতে দেখার পর, তাদের অনুসারীরাও সেসব শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।
তবে জুলুম, কওম বা মজলুমের মতো কিছু শব্দ বাংলাদেশে কিছু ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা আগে থেকেই তাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে ব্যবহার করে আসছেন।
মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফজাতে ইসলামের পক্ষে সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী রোববার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘পরাজিত ও চিহ্নিত কালচারাল ফ্যাসিস্টরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে জনমানসে দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়ানো কিছু ঐতিহাসিক আরবি-ফারসি শব্দের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে নেমেছে।’
তিনি ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’ ও ‘আজাদি’—এই শব্দগুলোকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভাষা-সম্পদ আখ্যায়িত করে জনপরিসরে ব্যাপকভাবে চর্চার আহ্বান জানিয়েছেন।
যদিও অনেকে মনে করেন, ইনকিলাব শব্দটি বেশি সামনে এসেছে শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর আলোচনায় আসা ইনকিলাব মঞ্চ নামক প্লাটফরমের কারণে।
এর প্রতিষ্ঠাতা ওসমান হাদি নির্বাচনের প্রচারের সময় ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
আবার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির বা এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের প্রায় সব নেতাই তাদের বক্তব্যের শেষে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। আবার ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিও দিয়ে থাকে, যার অর্থ বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
অন্যদিকে নয়া বন্দোবস্ত বারবার শোনা গেছে শেখ হাসিনা বিরোধী অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া অনেকের মুখেই। মূলত নয়া বন্দোবস্ত বলতে তারা দেশের জন্য নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছেন তাদের বক্তৃতায়।
কিন্তু এখন নতুন করে এসব শব্দ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে বলছেন এদেশে স্বাধীনতা শব্দটিই বহুল ব্যবহৃত, যাকে এখন অনেকে আজাদি হিসেবে বলছেন। আবার ইনকিলাবের চেয়ে বিপ্লব শব্দটাই বাংলাদেশে বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তেমনি তাদের মতে, ইনসাফের চেয়ে সুবিচার, জালিমের চেয়ে নিপীড়ক, মজলুমের চেয়ে নিপীড়িত এবং মুলুকের চেয়ে দেশ শব্দগুলোই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত।
তাদের কথা হলো, কথায় কথায় ইনসাফ, ইনকিলাব, জুলুম, নয়া বন্দোবস্ত না বলে এগুলোর বাংলা হিসেবে যেসব শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে সেগুলোই ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ, এই দেশের বেশির ভাগ মানুষ কথা বলার সময় এসব শব্দ ব্যবহার করেন না।
শব্দ বিতর্কে রাজনৈতিক নেতারা
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জে শনিবার ভাষা শহীদ দিবসের আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো এখন নতুন নতুন শব্দ শুনছি।’
তিনি বলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব মঞ্চ- এগুলোর বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা।’
আবার রোববার সকাল ৬টা ৮ মিনিটে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছে, ‘ইনশাআল্লাহ, আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ভেরিফায়েড পাতায় ‘আযাদীর সিনেমা’ লেখা ব্যানারের সামনে নিজের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও আযাদীর সিনেমা নামে সিনেমা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম, যেখানে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং একটিভিস্টরা বক্তব্যও দিয়েছিলেন। ভাষা নিশ্চল না। বদ্ধ কুঠুরিও না। যখন যে শব্দ দিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা সহজ স্বাভাবিক হবে, সেটাই চলবে। ভাষার দুয়ার খুলে দাও।’
এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ লাল ব্যানারে ইনকিলাব জিন্দাবাদ লিখে পোস্ট করেছেন শনিবার সন্ধ্যায়।
ভাষাবিদরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলছেন, ‘ইনকিলাব, ইনসাফ, আজাদি, মজলুম, বয়ান, বন্দোবস্তের মতো শব্দগুলো কোনোভাবেই বিকৃতি নয়, এগুলো হুমকিও নয়। এগুলোর ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তাহলে সেটাও তো ভালো হবে না। ভাষা ও শব্দ যাতে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজন তৈরি না করে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সব শব্দই আসলে বাংলা। ধ্বনিপদ্ধতি, গঠনরীতি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অর্থ পরিবর্তন করে এক ভাষায় অন্য ভাষার শব্দ প্রবেশ করতে থাকে। এটা খুবই অনায়াস একটা ব্যাপার। কিছু কিছু ভাষা চেষ্টা করে বিদেশি শব্দকে তার ভাষায় পরিভাষা করে কিংবা অনুবাদ করে প্রবেশ করাতে। কিন্তু আজকের বিশাল ও বিস্তৃত ডিজিটাল ও অনলাইন মাধ্যমে কোনোকিছু সচেতনভাবে আটকে রাখাও কঠিন। ইংরেজির আধিপত্যে যে কারণে পুরো পৃথিবীর বড় বড় ভাষাও শঙ্কিত। বাংলা ভাষাকে অধিকতর প্রযুক্তি-উপযোগী করে তুলতে না পারলে আমাদের ভাষাও ভবিষ্যতে সংকোচনের মধ্যে পড়বে; ভাষার জন্য হুমকি সেটাই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কাহালি বলছেন, ভাষা নদীর মতো প্রবহমান। বাঙালি সংস্কৃতির মতোই বাংলা ভাষাও অনেক ভাষার শব্দ নিজের সঙ্গে সমন্বয় করে আজ সমৃদ্ধ ও নিজস্ব রূপ লাভ করেছে।
তিনি বলেন, সময়ের প্রেক্ষাপটে হয়তো কিছু শব্দ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বলা হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। সময়ই ঠিক করে দিবে ভাষা কোনটিকে গ্রহণ করবে আর কোনটিকে করবে না। এটি চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ও নয় আবার এ নিয়ে শঙ্কিত হবারও কিছু নেই।
কাহালি বলেন, ‘বাংলা ভাষার ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় ভাষা নিয়ে অনেক বারই রাজনীতি হয়েছে। কিন্তু ভাষা থাকে মানুষের প্রাণে মনে মুখে আবেগে। ফলে চাইলেই তার খোলনলচে পাল্টানো যায় না। আর বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অস্তিত্বের।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত যেসব শব্দগুলো নিয়ে কথা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু আছে বলে মনে করি না। ভাষারও প্রাণ আছে, সে তার মতো করে গ্রহণ-বর্জন করে। যে শব্দ ভাষার স্বতঃস্ফূর্ততাকে অক্ষুণ্ণ রাখবে, প্রবাহকে আরও গতিশীল করবে, সুন্দর, সুমিষ্ট ও সমৃদ্ধ করবে সেগুলো থেকে যাবে।
মন্তব্য (০)