নিউজ ডেস্ক : শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে তীব্র বিস্ফোরণ আর স্বল্প উচ্চতা দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমানের গর্জনে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে আসে এক ব্যতিক্রমী ঘোষণা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর ‘বৃহৎ পরিসরের হামলা’ চালিয়েছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানে দেশটির বাইরে নিয়ে গেছে।
ট্রুথ সোশালে দেওয়া এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিন ধরে ‘অবৈধ’ বলে দাবি করা একটি সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধির কয়েক মাসের ধারাবাহিকতা চূড়ান্ত রূপ নেয়। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিচালিত অভিযানের অংশ হিসেবেই এই নাটকীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালাল
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কারণগুলো হলো অভিবাসন, মাদক এবং ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদ’।
ট্রাম্প বারবার ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর আগমনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসী দেশ ছেড়েছেন, যাদের অধিকাংশই লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে পুনর্বাসিত হয়েছেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মাদুরো ‘কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে’ বন্দিদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনে ‘বাধ্য’ করেছেন। তবে এ অভিযোগ কারাকাস সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ট্রাম্প মাদকের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ভেনেজুয়েলা কোকেন পাচারের একটি প্রধান ট্রানজিট রুট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেন্টানিল সংকটে অবদান রাখছে। তিনি ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী গোষ্ঠী—ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লোস সোলেস—কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, শেষোক্ত গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং মাদুরো।
কারাকাসের বক্তব্য, ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’কে হাতিয়ার বানিয়ে ওয়াশিংটন সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য অনুসরণ করছে।
কারাকাসের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসহ অন্যান্য সম্পদ দখল করতে চায়।
কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী স্বল্প সময়ের কিন্তু তীব্র এক অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে ভেনেজুয়েলা থেকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তিনি জানান, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যুক্ত ছিল এবং এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প পরিকল্পনা ও অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাদের প্রশংসা করেন।
কারাকাসে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সামরিক স্থাপনার আশপাশে বিস্ফোরণ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং আকাশে যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা এপির যাচাইকৃত ভিডিওতে শহরের আকাশে ট্রেসার গুলি ও ধোঁয়া এবং আরেকটি উপকূলীয় এলাকায় একই ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তোলে এবং সমর্থকদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ‘বহিঃশত্রুজনিত অস্থিরতা’ ঘোষণা করে।
কয়েক মাসের চাপ
সম্প্রতি ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের নৌ ও আকাশ শক্তি মোতায়েন করে, যার মধ্যে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বিমানবাহী রণতরীও ছিল। তেল অবরোধের অংশ হিসেবে সমুদ্রে দুটি তেল ট্যাংকার জব্দ করা হয় এবং মাদক পাচারের অভিযোগে ছোট নৌযানে চালানো হামলায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথাও যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করেছে। ট্রাম্প বলেন, কথিত মাদকবাহী নৌযান ব্যবহৃত একটি নোঙরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে—যা এই অভিযানে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকৃত হামলা।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, তারা মাদক কার্টেলগুলোর সঙ্গে একটি ‘সশস্ত্র সংঘাতে’ জড়িত।
মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের দখল পেতেই ওয়াশিংটন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হামলার কয়েক দিন আগেই মাদক পাচার ও অভিবাসন ইস্যুতে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
মন্তব্য (০)